খুলনার ডুমুরিয়ায় গত ১২ মে দুপুরে হরিণের মাংসসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনার পর জব্দ করা সেই মাংস ভাগ করে নেওয়া এবং ঘুষ নিয়ে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে।
প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রবিবার দুপুরে পুলিশের ওই দুই সদস্যকে খুলনা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। প্রত্যাহার হওয়া দুই পুলিশ সদস্য হলেন-কনস্টেবল মো. মাইনুল ইসলাম ও মো. মুছাব্বির হোসেন। তারা ডুমুরিয়া থানার শোভনা পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।
ডুমুরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আছের আলি জানান, ডুমুরিয়ার মাদারতলা এলাকার একটি টাওয়ার সংলগ্ন স্থান থেকে ১৫কেজি হরিণের মাংসসহ সুফল মন্ডল নামে এক ব্যক্তিকে হরিণের মাংস জব্দ করা হয়। শোভনা পুলিশ ক্যাম্পের ওই দুই সদস্য পরে মামলার ভয় দেখিয়ে সুফল মণ্ডলের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নেন এবং মাংস ভাগাভাগি করে নেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা জানা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের কালাবগির কালসার খালপাড় এলাকায় বন বিভাগের একটি টহলদল সাদ্দাম বৌদ্ধ, শফিকুল বৌদ্ধ, রুবেল মোল্লা, আমজাদ মোল্লা ও শরিফুল সরদারকে বিষ প্রয়োগে ধরা প্রায় তিনশ কেজি চিংড়িসহ আটক করে। পরে কালাবগি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুস সালামের সাথে স্থানীয় ডিপো মালিক কামাল সরদারের মোটা অংকের রফাদফায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বন বিভাগের কালাবগি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুস সালাম। তিনি দাবি করেন আটককৃত ব্যক্তিদের কাছে দুইটা নৌকার পাশ এবং অল্প পরিমাণে মাছ পাওয়ায় তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন-সংলগ্ন কালাবগি, সুতারখালী ও নলিয়ান এলাকার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, আটককৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় বিষ দিয়ে মাছ শিকারের পাশাপাশি হরিণ শিকারের অভিযোগ রয়েছে।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিম-এ দুই প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপের তথ্যমতে, বর্তমানে সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে। সম্প্রতি সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে অসৎ কিছু বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরা শিকারিচক্র।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, একশ্রেণির চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে সুন্দরবনের প্রাণীসম্পদ। সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে শত শত চিহ্নিত চোরা শিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র। এদের কেউ কেউ বংশ পরম্পরা সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িত। এসব বনঅপরাধী চক্রের রয়েছে গডফাদার।
তাদের কেউ কেউ চলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। উৎসব আসলেই সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। অবৈধ জেনেও হরিণের মাংস কেনেন অনেক মানুষ। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠে স্থানীয় চোরা শিকারিচক্র। সম্প্রতি বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফাঁদে আটকাপড়া এবং জবাই করা হরিণ, হরিণের মাংস-চামড়া, ফাঁদসহ আটক হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, সুন্দরবনে দেড়শ’রও অধিক চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। এসব পেশাদার শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করেন। এরপর হরিণের যাতায়াতের পথে ফাঁদ পেতে রাখেন। চলাচলের সময় প্রাণীগুলো সেই ফাঁদে আটকা পড়ে। পরে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ মিললে তারা আবার শিকারে আসেন।
এসব শিকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস। ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। চোরাশিকারিরা তখন জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন জনপদে সারা বছরই হরিণের মাংসের চাহিদা রয়েছে। উৎসব-পার্বণ ছাড়াও কেউ কেউ স্বজনদের হরিণের মাংস উপহার দেন। আবার বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্যও কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস সরবরাহ করা হয়। হরিণের চামড়া-শিং সৌখিনব্যক্তিরা সংগ্রহ করে ড্রইংরুম সাজান।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। উৎসবে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বেশি বেড়ে যায়। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় দৌরাত্ম্য বাড়ে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরা শিকারিচক্রের।
শুভ্র শচীন বলেন, যে পরিমাণ হরিণের মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দুই একটি অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরাশিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের মাংস বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হন, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন।
বন বিভাগ ও পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে সুন্দরবন প্রভাবিত খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করেন। এসব উপজেলার গ্রামগুলোতে বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। তাদের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ সুন্দরবনকেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা সবসময় তৎপর রয়েছে। বনে পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার ও ধ্বংস করায় হরিণ শিকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, উৎসব-পার্বণ উপলক্ষ্যে একশ্রেণির অসাধু লোকজন সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালায়। এ সময় চোরা হরিণ শিকারিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। তবে তাদের দমনে সার্বক্ষণিক টহল জোরদারসহ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর সময়ে ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৩৮০টি। এছাড়া ২ হাজার হাঁটা ফাঁদ ও ২০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনায় ৬৯ জনকে আসামি করে মোট ২২টি মামলা করেছে পূর্ব বন বিভাগ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬২ জনকে।
অন্যদিকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০ ফুট মালা ফাঁদ এবং ১ হাজার ২০০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৭৪৮টি। পশ্চিম বন বিভাগ মামলা করেছে ৫০টি। আসামি করা হয়েছে ১৩০ জনকে। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা-প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জালসহ সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই সমন্বিত অভিযানে মাংসসহ হরিণ শিকারি ধরা পড়ছে, বিপুল পরিমাণে ফাঁদ জব্দ হচ্ছে।
তবে সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা, সীমিত জনবল ও ভৌগোলিক জটিলতা এখনো সুন্দরবন রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে কার্যক্রম জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা সদর দপ্তর) এবং খুলনার রেঞ্জ ডিআইজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত এবং চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।