ক্যানসার চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী সাফল্যের খবর দিয়েছেন গবেষকরা। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস) একটি ক্যানসারবিরোধী ইনজেকশন পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে বহু রোগীর টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গবেষকেরা এই পরীক্ষার ফলাফলকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
যাদের ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার পর কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি, দুই ধরনের চিকিৎসাই কার্যকারিতা হারিয়েছিল, এমন রোগীদের ওপর ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ (Amivantamab) নামের এই ইনজেকশনটি প্রয়োগ করা হয়।
গবেষণায় মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগীর টিউমারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যায়। আর ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়।
লন্ডনভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি, উভয় চিকিৎসার প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এমন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া আগে দেখা যায়নি। চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এমন রোগীদের জন্য এই ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
তিনি আরও বলেন, এ চিকিৎসা প্রতি বছর হাজারো রোগীর উপকারে আসতে পারে।
গবেষণার ফলাফল বিশ্বের বৃহত্তম ক্যানসার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’ (এএসসিও)-এর বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার অষ্টম সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার ৮০০ জন এই রোগে আক্রান্ত হন। মুখগহ্বর, জিহ্বা, গলা, স্বরযন্ত্র ও নাকের বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
গবেষকদের মতে, ফুসফুসের ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও অ্যামিভান্টাম্যাব ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তনযুক্ত কিছু ফুসফুসের ক্যানসার রোগীর জন্য এটি গত বছর এনএইচএসে অনুমোদন পেয়েছে।
ওষুধটি তৈরি করেছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফুসফুসের ক্যানসারের পাশাপাশি কোলোরেক্টাল, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও গবেষণা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যামিভান্টাম্যাব তিনটি ভিন্ন উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে টিউমারের বিরুদ্ধে সক্রিয় করে, টিউমারের বৃদ্ধিতে সহায়ক একটি প্রোটিনকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ক্যানসার কোষকে চিকিৎসার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রক্রিয়াও প্রতিরোধ করে।
প্রতি তিন সপ্তাহে মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়। প্রচলিত শিরায় দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার তুলনায় এটি অনেক সহজ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলক কম।
রোগীর জীবনে ফিরেছে স্বাভাবিকতা
৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ এই ট্রায়ালে অংশ নেওয়া প্রথমদিকের রোগীদের একজন। ২০২৪ সালের মে মাসে তার জিহ্বার ক্যানসার ধরা পড়ে। কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি কার্যকর না হওয়ায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি ‘অরিগএএমআই-৪’ ট্রায়ালে যোগ দেন।
কার্ল বলেন, চিকিৎসা শুরুর আগে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না, খেতেও কষ্ট হতো। মুখে ফোলা ও ব্যথা ছিল। ইনজেকশন নেওয়ার পর ফোলা অনেক কমেছে, ব্যথাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।”
তিনি জানান, আগে তাকে স্যুপ, রাইস পুডিং, রাভিওলি ও স্প্যাগেটির মতো নরম খাবারের ওপর নির্ভর করতে হতো। ওজনও কমে গিয়েছিল। তবে চিকিৎসার মাত্র দুই ধাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই তার স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস ফিরে আসতে শুরু করে। ছয় মাসের মধ্যে তিনি প্রায় সব ধরনের খাবার খেতে সক্ষম হন।
কার্ল বলেন, অনেক দিন পর প্রথমবারের মতো বড় একটি স্টেক খাওয়ার আনন্দ এখনও মনে আছে। এখন আমার কথা বলাও পুরোপুরি স্বাভাবিক, কর্মক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা ছাড়াই কাজ করতে পারছি।
গবেষণায় মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংশ্লিষ্ট তুলনামূলক সহজে নিরাময়যোগ্য ক্যানসার রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত জটিল ও কঠিন রোগীদের মধ্যেই এই ফল পাওয়া গেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অ্যামিভান্টাম্যাব গ্রহণকারী রোগীরা চিকিৎসা শুরু করার পর গড়ে ১২ দশমিক ৫ মাস বেঁচে ছিলেন। অথচ এ ধরনের জটিল ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের গড় আয়ু সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
আইসিআরের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, এই গবেষণা দেখিয়েছে, নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের মাধ্যমে সীমিত চিকিৎসা-সুবিধাপ্রাপ্ত রোগীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। টিউমারের এমন প্রতিক্রিয়া এবং বেঁচে থাকার সময় বৃদ্ধির ফলাফল নিঃসন্দেহে ক্যানসার চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।