যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলা এবং এর জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লেগে যাওয়ার পর ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলেও কেটেছে। তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাঠের বাইরের রাজনীতি ও জাতীয় প্রতীক নিয়ে এক নতুন আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
এবারের বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের ঐতিহাসিক ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ (সিংহ-সূর্য) খচিত বিপ্লব-পূর্ব পতাকা। একদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রবাসীদের আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের কঠোর শর্ত—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই উত্তপ্ত ফুটবল অঙ্গন।
আগামী ১১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। এবারের আসরে গ্রুপ ‘জি’-তে থাকা ইরানের তিনটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে—দুটি ক্যালিফোর্নিয়ায় এবং একটি সিয়াটলে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানিদের একটি বিশাল অংশ ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন, যাদের বেশিরভাগই ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব ও বর্তমান শাসনব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। এই প্রবাসী গোষ্ঠীটি বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারিতে ইরানের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘সিংহ-সূর্য’ খচিত পতাকা প্রদর্শনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের দাবি, ফিফা তাদের ভেন্যু নির্দেশিকায় এই ঐতিহাসিক পতাকাটি নিষিদ্ধ করতে পারে। এমন গুঞ্জনের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রবাসীদের মানবাধিকার সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর ভয়েসেস অব লিবার্টি’। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা জারি হলে বিষয়টি ক্যালিফোর্নিয়ার রাজ্য বা ফেডারেল আদালতে গড়াবে এবং ফিফাকে সরাসরি আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
আইনি পরামর্শক শাহরুখ মোখতারজাদেহ জানান, "ফিফা যদি ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ খচিত পতাকাটি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আমরা উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
এ বিষয়ে ফিফার কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হলে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে কেবল তাদের সাধারণ ‘নিষিদ্ধ সামগ্রীর তালিকা’ তুলে ধরে। যেখানে বলা হয়েছে—স্টেডিয়ামের ভেতর ‘রাজনৈতিক, আপত্তিকর এবং/অথবা বৈষম্যমূলক প্রকৃতির’ যেকোনো উপাদান নিষিদ্ধ। তবে এই ঐতিহাসিক পতাকার কোন অংশটি নীতিমালার লঙ্ঘন, তা স্পষ্ট করেনি ফিফা।
এদিকে ইরানের ফুটবল প্রধান মেহদি তাজ তেহরানে ফিরে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত অননুমোদিত পতাকার ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, "আমরা এই শর্তেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাব যে, ইরানের ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়ামে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের (বর্তমান) পতাকা ছাড়া অন্য কোনো পতাকা আনা যাবে না।"
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধীদের কাছে এই ঐতিহাসিক পতাকাটি এখন আর কেবল কোনো রাজনৈতিক প্রতীক নয়; এটি তাদের ছিনতাই হয়ে যাওয়া জাতীয় পরিচয় পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার। সাম্প্রতিক দেশীয় আন্দোলন ও যুদ্ধের পর প্রবাসীদের অনেকেই বর্তমান ফুটবল দলটিকে আর নিজেদের ‘জাতীয় দল’ বা ‘টিম মেল্লি’ বলে মনে করছেন না। তাদের দাবি, সরকার যদি খেলার মঞ্চকে রাজনৈতিক বৈধতার জন্য ব্যবহার করতে পারে, তবে তারা কেন গ্যালারিতে তাদের আসল ইরানকে তুলে ধরতে পারবেন না?