ঈদযাত্রায় মৃত্যুরোধ সম্ভব?

নানা প্রস্তুতি, ব্যবস্থাপনা তবু প্রতি বছর ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় বিষাদের সুর বেজে ওঠে। এর মূল সমস্যা ও ধরন এক থাকার কারণে, দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কোনোটাই ঠেকানো যাচ্ছে না। দীর্ঘসময় ধরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে, আমরা দেখছি, কয়েক দিন হা-হুতাশ এরপর সব ঠিক। মনে হয়, কিছুই হয়নি। কিন্তু যার হয়েছে, একমাত্র তার পরিবার জানে তারা কী হারিয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, প্রতি ঈদের আগে-পরে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য তুলে ধরে সমাধানের জন্য বেশকিছু সুপারিশমালা দেয়। মূলত ঈদ চলে গেলে ঈদের কর্মযজ্ঞ নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যথা থাকে না। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে অনীহার কারণে, পরবর্তী ঈদ এলে আবার সেই ভোগান্তি, বিভিন্ন পথে মৃত্যুর মিছিল। আবার হইচই শুরু। ব্যাপক ঢাকঢোল পিটিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা নির্মূলের চেষ্টা চালানো হয়। অথচ কাজের কাজ তেমন কিছু হয় না। যে কারণে চলার পথে মৃত্যু মিছিল প্রতি বছর দীর্ঘ হচ্ছে।

বিগত ঈদুল ফিতরে আমরা দেখেছি, বিএনপি সরকার শপথ গ্রহণের কয়েক দিন দিন পর মাহে রমজান শুরু হয়েছিল। এক মাসের মাথায় ঈদযাত্রা। নতুন সরকার, নতুন মন্ত্রী কিছু বুঝে ওঠার আগে এত বড় ঈদ ব্যবস্থাপনা, সে কারণে আমরা সরকারের ব্যর্থতা খুঁজতে নয় বরং সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদযাত্রায় প্রাণহানির পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলাম। সরকার নতুন হলেও পুরনো আমলা, পূর্বের মাফিয়া নেতাদের অনুসারী বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান সরকার সর্মথিত নেতাদের চাপে আওয়ামী লীগ সরকারের মতো এবারও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএসহ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার ঈদ ব্যবস্থাপনা সভায় লাখো যাত্রীসাধারণের পক্ষে কথা বলার মতো যাত্রী ও নাগরিক সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। মালিকরা একচেটিয়া সুবিধা লুফে নিতে, এমন অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়, বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন প্রভাবমুক্ত থাকায় ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছিল এবং প্রাণহানি কিছুটা কমেছিল যা সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বিগত ঈদে বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারণে ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবহনের বিশৃঙ্খলা অন্তর্বর্তী সরকারের দুটি ঈদের তুলনায় বেড়েছে। অতীতের মতো সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল বাস মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রিত। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সড়কমন্ত্রীর পন্থা অনুসরণের কারণে পরিবহন সেক্টরে সরকারের কিছু কিছু কর্মকা- ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি কেবল যাত্রীসাধারণের সচেতনতা  তৈরি, সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সক্রিয় রাখা, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফোরামে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা ও যাত্রী হয়রানি প্রতিকারের বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ার মানসে দীর্ঘদিন ধরে আপসহীনভাবে মাঠে সক্রিয় রয়েছে এবং বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সড়ক নিরাপত্তা ও যাত্রী দুর্ভোগ নিরসনের বিষয়টি প্রাধিকার পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সংকট  তৈরি হচ্ছে। মধ্যবিত্ত দরিদ্রতার কাতারে নেমে আসছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন পথে দুর্ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্টকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এবং বাস্তব অনুমানভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। এই পার্থক্য শুধু সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে না, বরং এটি দেখায় যে, দেশে দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থায় এখনো বড় দুর্বলতা রয়েছে। বিগত পবিত্র ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ১০৪৬ জন আহত হয়েছিল। একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত, ২২৩ জন আহত হয়েছিল। নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ হয়। সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বমোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১২৮৮ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২১৭৮ জন ভর্তি হয়েছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে গত ১৫ দিনে হতাহত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এবারের ঈদুল আজহায় টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৭ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছে এবং একই ট্রাকে ভ্রমণকারী আরও ১০ জন শ্রমিক গুরুত্বর আহত হয়েছে। তারা সবাই ঈদযাত্রায় বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে স্বল্প ভাড়ায় চট্টগ্রাম থেকে গাইবান্ধা যাচ্ছিলেন। ঈদের আগের দিন সকালে রাজধানী নদ্দায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪ জন নিহত, ১০ যাত্রী গুরুতর আহত হয়। ঈদের দিন দুপুর ১২টায় গোপালগঞ্জের সদর উপজেলায় বাস ও বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহত, ২৫ জন গুরুতর আহত হয়। ঈদের রাত ৮টায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় বাস ও লেগুনা মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। ২৪ মে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় বাস ও অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহত, ৫ জন আহত হয়। ২৩ মে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮ জন নিহত, ৩০ জন আহত হয়। ২১ মে ঈদযাত্রার শুরুর দিন থেকে ৩০ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩১ জনের প্রাণহানি ও ৫৬১ জন আহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। যদিও হাসপাতালের তথ্যে এর সংখ্যা কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা আগের তুলনায় ভালো থাকায় যানবাহনে গতি বেড়েছে। সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে যাত্রী সচেতনতার কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। এবারের ঈদে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার অঙ্গীকার করলেও, এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে অধিকাংশ রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের  নৈরাজ্য ও পথে পথে যাত্রী হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের কারণে বাস-ট্রেন-লঞ্চের ছাদ, খোলা ট্রাক ও পণ্যবাহী পরিবহনে যাত্রী হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, দরিদ্র লোকজনদের ঈদে বাড়ি যেতে হয়েছে। তবে দীর্ঘ ছুটিতে ধাপে ধাপে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ থাকায়, যাতায়াতে দুর্ভোগ ও সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা কমেছে। দীর্ঘদিন থেকে বহাল সড়কের নানা অব্যবস্থাপনা, লক্কড়-ঝক্কড় মেয়াদোত্তীর্ণ রেলপথ এবং যাত্রীসাধারণের অসচেতনতা, গণপরিবহন সংকটসহ নানা কারণে কিছু কিছু পথে ভোগান্তি বেড়েছে। সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, দক্ষ চালক ও উন্নত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে, সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনিয়ম দুর্নীতি ও মালিক সমিতির প্রভাব মুক্ত রেখে, মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের আমদানি বন্ধ করে দেশব্যাপী উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে, এই দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এ ছাড়াও  দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা অবাধে চলাচল বন্ধ করা।

জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা, রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা। সড়কে মিডিয়ামে রোড ডিভাইডার না থাকা, অন্ধবাঁকে গাছপালায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে কিছু কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের নানাবিধ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন। বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং একজন চালক অতিরিক্ত সময় ধরে যানবাহন চালানো। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের কারণে বাসের ছাদে, খোলা ট্রাক ও পিকআপে, ট্রেনের ছাদে, বাসের ইঞ্জিন বনাটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণের যাতায়াতের কারণে কিছু কিছু দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনামুক্ত ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে, দেশের যাতায়াত পথে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতি চালু করা দরকার। বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘণ্টা ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করতে হবে।

পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাস মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে। সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পরিবহন চালকদের চাকরির বিধিমালা তৈরি করে বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি কেউ যাতে জাতীয় মহাসড়ক হেঁটে পারাপার হতে না পারে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে ডেডিকেটেড বাস লেইন চালুর মাধ্যমে উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক । নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট নিশ্চিত করে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে গবেষকদের সমন্বয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু করতে হবে। ঈদযাত্রায় একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমানো জরুরি যে কারণে দেশব্যাপী কর্মসংস্থান বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই।