চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত দেশটির বিভিন্ন কোম্পানির সহযোগী বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলে চিপ পাচারের আশঙ্কার মুখে এই কড়া নোটিশ জারি করা হলো।
রবিবার (৩১ মে) মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক নির্দেশনায় জানিয়েছে, উন্নত মানের এআই চিপ রপ্তানির ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা মূলত চীনভিত্তিক সদর দপ্তর বা মূল কোম্পানি রয়েছে এমন সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি’ (বিআইএস) এই স্পষ্টীকরণ নোটিশটি জারি করেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেওয়া ‘ফ্রেমওয়ার্ক ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডিফিউশন’ (এআই চিপের বিস্তার রোধক কাঠামো) বাতিল করার পর, পূর্ববর্তী লাইসেন্সিং নিয়মগুলো এখনো কার্যকর রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এই ব্যাখ্যা দিল সংস্থাটি।
নোটিশে বিআইএস সরাসরি উল্লেখ করেছে, ‘এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, নিয়মটি এখনো কার্যকর।’
বাইডেন প্রশাসনের মেয়াদের একেবারে শেষ দিনগুলোতে এই ফ্রেমওয়ার্ক বা নীতিমালার খসড়া উন্মোচন করা হয়েছিল। এতে বিশ্বজুড়ে এআই চিপের বাজার নিয়ন্ত্রণে একটি বৈশ্বিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলো ছাড়া বাকি সবার ক্ষেত্রে চিপ রপ্তানিতে সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
তবে এই নীতিমালার তীব্র বিরোধিতা করে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি জায়ান্ট। তারা এই প্রস্তাবকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করে।
পরবর্তীতে গত মে মাসে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের আগেই তা বাতিল করে দেয় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই নীতিমালায় ‘অতিরিক্ত ও কষ্টদায়ক নিয়ন্ত্রণমূলক শর্ত’ রয়েছে এবং এটি অন্যান্য দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
এদিকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া জানিয়েছে, তাদের উৎপাদিত সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ‘ব্ল্যাকওয়েল জিপিইউ’ চীনে রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তারা সরকারের এই স্পষ্টীকৃত নিয়ম মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
এনভিডিয়ার একজন মুখপাত্র সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই নির্দেশনার মাধ্যমে এটাই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে যে, এনভিডিয়ার বিক্রয় ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সঠিক ছিল। আমাদের বর্তমান কার্যপদ্ধতি অনুযায়ী, চীনভিত্তিক (পিআরসি) সদর দপ্তর রয়েছে এমন কোম্পানিতে নিয়ন্ত্রিত পণ্য সরবরাহের জন্য লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক।’
এই বিষয়ে এনভিডিয়ার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এএমডি ও ইনটেল, এবং এনভিডিয়াসহ বিভিন্ন বড় কোম্পানির চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি-এর সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বিআইএস-এর পক্ষ থেকেও বাড়তি কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
তবে বাইডেন প্রশাসনের প্রযুক্তি নীতি বিভাগে কাজ করা সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা ক্রিস ম্যাকগুয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন রপ্তানি নীতি শিথিল করায় চীনা কোম্পানিগুলো চিপ কেনার একটি বড় ফাঁকফোকর পেয়ে গিয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ম্যাকগুয়ার বলেন, চীনা কোম্পানিগুলো খুব সম্ভবত বড় পরিসরেই এই চিপগুলো কিনে আসছিল। যেহেতু বিআইএস তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা আপডেট করে স্পষ্ট করে বলেনি যে তারা ঠিক কোন নিয়মটি কার্যকর করছে, তাই এতদিন এই চিপ কেনা সম্পূর্ণ বৈধ ছিল।
তিনি আরও যোগ করেন, এই নতুন স্পষ্টীকরণের ফলে চীনের বাইরে থাকা চীনভিত্তিক কোম্পানিগুলোর কাছে ‘ব্ল্যাকওয়েল’ চিপ সরবরাহ করা আবারও অবৈধ হয়ে গেল—যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি অলরেডি হয়ে গেছে, তা বুঝতে আমাদের দেখতে হবে এ পর্যন্ত কতগুলো চিপের চালান চলে গেছে। বিআইএস-এর বিবৃতিতে পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে এই ফাঁকফোকর দিয়ে চিপ সরবরাহ করা হয়েছে। কারণ তারা বলেছে, যারা এই ফাঁক গলিয়ে চিপ কিনেছে, তাদের চিপ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এর অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংয়ের কাছে উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য সরবরাহের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে।
অবশ্য গত ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় ছাড় ঘোষণা করেন। তিনি এনভিডিয়াকে তাদের উৎপাদিত ‘এইচ২০০’ চিপ চীনের বাজারে বিক্রির অনুমতি দেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আগের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের তুলনায় একটি বড় ধরনের শিথিলতা।
যদিও ‘এইচ২০০’ এনভিডিয়ার সবচেয়ে আধুনিক চিপ নয়, তবুও এর আগে চীনের বাজারে রপ্তানির অনুমতি পাওয়া ‘এইচ২০’ চিপের তুলনায় এটি প্রায় ছয় গুণ বেশি শক্তিশালী।
সূত্র: আল-জাজিরা