সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থায় ভুগছে ক্রীড়াঙ্গন

বর্তমান সরকার ক্রীড়াচর্চাকে শুধু উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে না, বরং একে গুরুত্বের তালিকায় রেখেছে। বিষয়টি ক্রীড়ানুরাগী মহল ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। সবাই চাইছে, ক্রীড়াঙ্গন ভুল চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসুক। ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সুশাসন, জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা এবং সুশৃঙ্খলার মাধ্যমে। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতি একদম ভিন্ন। এই সংস্কৃতিকে বুঝতে না পারলে কখনো পরিণাম ভালো হয় না। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসার পর সবাই দেখেছে, অপরিপক্ব যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধরনের ক্ষতি করা হয়েছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে করে চলমান ক্রীড়াচর্চায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। একটি কাঠামো বা ব্যবস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে বা ভেঙে পড়লে, তাকে আবার দাঁড় করানো খুব কঠিন। সেই অভিজ্ঞতা তো এবার সবার হয়েছে। এই যে ক্রীড়াঙ্গনের জীবন থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেল এর জবাব দেওয়ার কেউ নেই। কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত ক্রীড়াঙ্গনের বারোটা বাজিয়েছে।

দেশে ক্রীড়াঙ্গন রূপান্তরে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নেই, উৎসাহ নেই, তারা ব্যস্ত অন্যান্য ক্ষেত্রে। বর্তমান দুনিয়ায় প্রতিটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গুরুত্ব কারও অজানা নয়। ক্রীড়াঙ্গনের মাধ্যমে দেশকে যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা সম্ভব হয়, অন্য কোনো ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রীড়াঙ্গনের আছে ভিন্ন পরিচয় বিষয়টি বুঝতে হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সময় অনেক বয়ে গেছে। গড়িমসি বা ঢিলেমির এখন আর সময় নেই। যারা এক সময় ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল, তারা ক্রীড়াঙ্গন বুঝে সঠিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে আমাদের টপকে এগিয়ে চলেছে। আমাদের উচিত, ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যাগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে পথ খুঁজে নেওয়া। আর এই উদ্যোগে ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট সর্বমহলকে সংম্পৃক্ত করলে ভালো ফল মিলবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, পর্যাপ্ত মানবসম্পদ। কয়েক বছর পর এই সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। ক্রীড়াঙ্গনে ভুল এবং অব্যবস্থাপনার কারণে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। আমরা পড়ে আছি তিমিরে। প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারলে ক্রীড়াঙ্গন পারবে না জাতির আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে। জাতীয় স্বাধীনতার চেতনায় বিবেচিত হওয়া উচিত ক্রীড়াঙ্গনের আবেগ ও আদর্শবোধ। জনস্বার্থ পরিপন্থি ক্রীড়াঙ্গন কাম্য নয়। ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিষ্ঠানগুলো ভুগছে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাবে। ব্যক্তি এবং সমষ্টির ক্ষেত্রে যুক্তি ও আদর্শের বড় অভাব। ক্রীড়াঙ্গনে ব্যবস্থাপনা বিতর্কিত এবং দুর্বল। এই অঙ্গনে সুশাসনের বিষয়টি গুরুত্বহীন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনের বিচ্ছিন্নতার উত্তরণ ঘটেনি। প্রকৃত অর্থে ক্রীড়াঙ্গনে নেই সমতা। নারী-পুরুষে বৈষম্য বেড়ে চলেছে। ক্রীড়াঙ্গন হয়নি কল্যাণমুখী এবং মানবিক। ক্রীড়াঙ্গনের জীবনে নৈতিকতা ‘পারদ’ নিম্নমুখী। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পদে পদে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। ক্রীড়াঙ্গনে স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্ব হারাচ্ছে। দ্বিচারিতায় ভরপুর ক্রীড়াঙ্গন। ক্রীড়াঙ্গনের সুপারিশগুলো কর্র্তৃত্ববাদ নিয়ন্ত্রণের সদিচ্ছা থেকে রচিত। আমিত্ববাদ থেকে ক্রীড়াঙ্গন মুক্ত হতে পারছে না। ক্রীড়াঙ্গনে নেই সঠিক নীতিমালা। স্বপ্ন দেখা ও তা বাস্তবা১য়নের জন্য চাই সাহস এবং ইতিবাচক মানসিকতা। এ ক্ষেত্রে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ক্রীড়াঙ্গনে প্রয়োজন রাজনৈতিক ‘ম্যান্ডেট’, প্রয়োজন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ। বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের সুস্পষ্ট কতগুলো প্রতিশ্র“তি ছিল ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে। এখন এগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে আর তাই আশাবাদী না হওয়ার কারণ নেই। নতুন চিন্তা ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ক্রীড়াঙ্গনকে আলোকিত করতে।সবাই পরিবর্তন চাচ্ছে। এই পরিবর্তনের লক্ষ্য তো নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় করা জরুরি। লক্ষ্য ছাড়া তো পরিবর্তনের ফসল ঘরে উঠানো সম্ভব হবে না। নতুন বোতলে পুরনো জোগান দেওয়ার কসরত অতীতে বিভিন্ন সময় দেখেছি। ঘুণে ধরা ক্রীড়াঙ্গন থেকে মুক্তি দরকার।

মানুষ আর পুরনো ঘুণে ধরা ক্রীড়াঙ্গন দেখতে চায় না। দেখতে চায় না মিথ্যাচারের বেসাতি ভরপুর ক্রীড়াঙ্গন। কিছুদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, আমি চেষ্টা করছি। তিনি সত্যি চেষ্টা করছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। আশা করব, আমিনুল হক জনপ্রিয় নয়, একজন সফল ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে পরিচিত হবেন।