সাধারণত আমজনতা স্টক এক্সচেঞ্জকে এককভাবে পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজার মনে করে থাকে। স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বলেন, দেশের উন্নয়নে স্টক এক্সচেঞ্জ পুঁজি সরবরাহ করে থাকে। অতএব স্টক এক্সচেঞ্জকে সক্রিয় করার জন্য প্রতি বছর প্রাকবাজেট আলোচনার জন্য হাজারটা প্রস্তাব নিয়ে আশা হয়। পুঁজিবাজারের দুটো স্তর রয়েছে। আইপিও, যা বাংলায় বলা হয় প্রাথমিক গণ-আহ্বান। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা পরিষেবাসহ অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের জন্য জনগণের কাছ থেকে পুঁজি আহ্বানই হলো আইপিও। কয়েক শতাব্দী ধরে এই প্রক্রিয়ায় পুঁজি সংগ্রহ হয়ে আসছে। এই পুঁজি কোনো ঋণ নয়; বরং জনগণের কাছে যে গচ্ছিত আমানত থাকে তারই অংশ বিশেষ সংগ্রহ করে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সহায়ক এই অর্থ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেলওয়ের বড় উন্নয়ন হয়েছে এই আইপিওর মাধ্যমে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, বিশে^র বহু দেশেই এভাবে রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতি ঘটেছে আইপিওর মাধ্যমে।
কেউ কেউ যদি আইপিওর মাধ্যমে পাওয়া শেয়ার আর রাখতে না চান, অথবা কিছু বেশি মুনাফার প্রত্যাশা করেন, একটা আইন রয়েছে, কোম্পানি প্রয়োজন মনে করলে নিজের কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাক করতে পারে। কিন্তু কোনো কোম্পানি ঋণ হিসেবে পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে সে টাকা জগদ্বল পাথরের মতো কোম্পানির বুকে চেপে ধরে থাকে, ফেরত দেওয়া না পর্যন্ত। উপরন্তু সুদ তো রয়েছেই। স্টক এক্সচেঞ্জ সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, কোম্পানির শেয়ার কতটা কেনাবেচা হলো, এ নিয়ে কোম্পানির কিছু আসে-যায় না। তবে পরোক্ষভাবে একটা ভূমিকা রয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জে যদি শেয়ারবাজার চাঙ্গা থাকে তাহলে অন্যান্য উদ্যোক্তরা উৎসাহ পাবেন নতুন নতুন আইপিওতে আসতে। পুঁজির বাজারের অপরিহার্য অংশ স্টক এক্সচেঞ্জ। তবে একটি কথা বলা যায়, শেয়ার নিয়ে কেলেঙ্কারি কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জে ঘটে। আইপিওতে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়ার পর সেখানে কোনো অনিয়ম বা অন্য কেলেঙ্কারির অবকাশ থাকে না। কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জ চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন স্ক্যাম (এ হলো প্রতারণার একটি কৌশল) ঘটেছে। ১৭২৪ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে এক বিরাট কেলেঙ্কারি ঘটল। সাউথ সি কোম্পানি নামক একটি কোম্পানির শেয়ার কয়েক দিনের ভেতর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেল। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠন করল। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী, যাকে চ্যান্সেলার অব দি এক্সচেকার বলা হয়, দোষী সাব্যস্ত হলেন এবং তখনকার নিয়ম অনুযায়ী তাকে টাওয়ারে বন্দি করা হলো। এ রকম আরও বহু দেশে এ ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছে। তবে এর বিচারও হয়েছে। ভারতে হারনাদ মেহতা নামে এক শেয়ার কেলেঙ্কারির খলনায়ক জেলেই মারা গেছেন। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি কোনো সমাজেই কাম্য নয়। অতীতে শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারির দৃষ্টান্তযোগ্য বিচার হয়নি এবং কেন হয়নি তা সচেতন মানুষ মাত্রই জানা। কেলেঙ্কারির পথ যেন আর উন্মুক্ত হতে না পারে নজর থাকুক সেদিকে ।
গত দেড় বছর হতে চলল, একটি আইপিও ছাড়া হয়নি। অবশ্য সম্প্রতি অংশীজনরা একাধিক সেমিনারের আয়োজন করে আইপিওর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন এবং প্রতিবদ্ধকতা দূর করার জন্য ব্যবস্থা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বেশ আগে একজন বলেছিলেন, বাংলাদেশে সেমিনার শিল্পের খুব উন্নতি হয়েছে। যেকোনো বিষয়ে বেশ কিছু সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনেক গবেষণামূলক কথাবার্তা বলা হয়। এসব গবেষণার কথা উঠলে চোখের সামনে বিশ্বের অন্যতম রম্যলেখক জনাথন সুইফটের ছবি ভেসে ওঠে। এই ইংরেজ লেখকের নায়ক গ্যালিভার কল্পনার এক রাজ্যে গিয়ে দেখেন, সেখানে কয়েকজন গবেষক গভীর চিন্তায় মগ্ন। তারা তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্বন্ধেও ওয়াকিবহাল নন। গ্যালিভার একজনকে গবেষণার কথা জিজ্ঞাসা করলে গবেষক বললেন, তিনি শসা থেকে সূর্যালোক উৎপাদনের চিন্তা করছেন। স্টক এক্সচেঞ্জে জন্মলগ্ন থেকে আইপিও ব্যবস্থা বিদ্যমান। বাংলাদেশেও কয়েকশ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। ১৯৮৬-৮৭ সালে গোটা বিশ্ব বিরাষ্ট্রীয়করণের প্লাবনে প্লাবিত হয়। এর আগে সমাজতন্ত্রের ঢেউয়ে অনেক দেশে বহু শিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭-৯০ সালে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের আংশিক বিরাষ্ট্রীয়করণ করে। তখন বেশ কয়েকটি বেসরকারি শিল্প আইপিওর আশ্রয় নেয়। এমনও হয়েছে, মাসে দুটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অত্যন্ত সুন্দরভাবে আইপিওর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আইপিওর মাধ্যমে যত সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ার মার্কেটে আসবেন, স্টক এক্সচেঞ্জ তত বেশি সক্রিয় হবে। পুঁজিবাজারের ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কীভাবে এবং কেন নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলো তা অনেকেরেই জানা। ১৯৯২ সালের বাজেটে ঘোষণা দেওয়া হয়, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছর থেকে শেয়ারবাজারে অনাবাসিকরা বিনিয়োগ করতে পারবেন। বস্তুত এর দ্বারা বিদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো। প্রথমে বলা হলো, স্টক এক্সচেঞ্জে এরা বিনিয়োগ করতে পারবেন। পরে বলা হলো, আইপিওতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তখন একটা পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। আইপিওতে কোটা এবং সময় নির্ধারণ করা উচিত ছিল ব্যাপকভাবে যেকোনো আইপিওতে বিদেশিরা অংশগ্রহণ করলে। পরে বোঝা গেল, বাংলাদেশের টাকা হংকংয়ে গিয়ে ডলারে রূপান্তরিত হয়ে আবার ঢাকায়। এ যেন পরশ পাথর। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলেন এবং এ ধরনের বিনিয়োগের ওপর লকইন আরোপ করলেন।
আওয়ামী ঘরানার অর্থনীতিবিদদের চাপে লকইন প্রত্যাহার করা হলো। বন্যা প্রতিরোধ বাঁধের দুয়ার খুলে দেওয়া হলো। এরপরে শেয়ারবাজারে ঘটল গ্রেটস্ক্যাম। বেশ আগে একবার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, শিল্প রুগ্ন হয় কিন্তু মালিক রুগ্ন হন না। শেয়ারবাজারেও শেয়ার দালালরা সর্বস্বান্ত হন না, সর্বনাশ হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীর। দুঃখজনক ঘটনা হলো, ২০০৯-২০১০ সালে শেয়ারবাজারে দ্বিতীয় বিপর্যয় ঘটল। তখন খলনায়ক ছিল কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ প্রয়াত ইব্রাহিম খালেদ তার তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছিলেন, শেয়ার ব্যবসা চলাকালীন কোনো ব্যাংকে ব্যাংকিংয়ের কোনো কাজ হতো না, সবই হতো শেয়ার বাণিজ্য বোর্ডের সামনে। অনেক ব্যাংকে ভুয়া বিও অ্যাকাউন্ট ছিল । বলা বাহুল্য, শেয়ার লেনদেন করতে হলে বিও অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। স্টক এক্সচেঞ্জ প্রাইভাটে ক্লাবের মতো চলছিল। ২০১৩ সালে দেশের দুটো স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিমিউচিয়ালাইজেশন করা হয়। সদস্যরা এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে গণ্য করতেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের ভেতরও বিভাজন ছিল। কিছু সংখ্যক সদস্য অধিক শক্তিশালী ছিলেন। তাদের কথামতো এক্সচেঞ্জের প্রশাসন চলত। সেখানেও আবার উপ-দল ছিল। মিউচিয়ালাইজেশনের ফলে এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদ দেখা যায় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর। সাতজন পরিচালক সরকার কর্র্তৃক নিয়োগকৃত। চারজন নির্বাচিত হন শেয়ার ব্রোকারদের মাধ্যমে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকার বলে পরিচালক। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সরকার কর্র্তৃক নিয়োজিত সাতজন পরিচালকের ভেতর থেকে। বর্তমানে প্রশাসন ব্যবস্থা আমলান্ত্রিক, যে ব্যবস্থা সহজে জনমুখী হতে চায় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ব্যুরোক্রেসি বলিতে সবত্রই সেই কর্তাদের বোঝায়, যারা বিধাতার সৃষ্ট মনুষ্যলোক লইয়া কারবার করেনা। যারা নিজের নিজের বিধান রচিত একটা
কৃত্রিম জগতে প্রভুত্বজাল বিস্তার করে।’ কিছুদিন আগে আইপিওর ক্ষেত্রে একটা আইন করা হয়েছিল। কেউ আইপিওতে আবেদন করতে গেলে যে টাকা লাগবে, তার চেয়ে বেশি একটা টাকা আবেদনকারীর বিও অ্যাকাউন্টে থাকতে হবে। এটি কোনো গণমুখী বিধান ছিল না। অবশ্য এখন ওই কালাকানুনটি বহাল নেই।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাই মাঝে মাঝে কর্মকর্তাদের যৌথ ভ্রমণের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। বেশ কিছুদিন আগে রোড শোর নামের একাধিক মহাদেশ যৌথভাবে ভ্রমণ করলেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মকর্তারা। ফল অবশ্য বিগ জিরো। সোজা কথায় বলতে হয়, আইপিওর নিয়মকানুন সহজ-সরল হতে হবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোনো বিধান যেন গণবিমুখ না হয় তা আমলে রাখতে হবে। কিছু শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির মালিক সাজতে চান কয়েকটি শেয়ার নিয়ে। তা ব্যাধি সমতুল্য। মনে রাখতে হবে, করপোরেট কালচার যত বাড়বে, ততই এসব কুঅভ্যাস দূর হবে। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যত স্বচ্ছ হবে শেয়ারহোল্ডাররা ততই আপ্লুত হবেন এবং নিশ্চয় ধন্যবাদ জানাবেন কর্র্তৃপক্ষকে।
এখন স্টক এক্সচেঞ্জ শুধু শেয়ার নিয়েই ব্যস্ত নয়। বিশ্বের অর্থনৈতিক ধারা একদিকে প্রবাহিত হয় না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধারার বিভক্ত হয়। এখন চলছে ফাইন্যান্সিয়ালিজম, যাকে বলা হয় অর্থবাদ। শেয়ারবাজারের পুঁজি আসে কোনো উৎপাদনমুখী কাজের মধ্যে দিয়ে। তাতে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। জিডিপি বাড়ে। বিশ^ব্যাপী শেয়ারবাজারের বিভিন্ন আর্থিক ইন্সট্রুমেন্টস নিয়ে বিরূপ সমালোচনা হচ্ছে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলছেন, এসব আমাদের আরও পথভ্রষ্ট করছে, কেননা এক অর্থ আরেক অর্থকে গ্রাস করে চলেছে। আমাদের প্রয়োজন আইপিও বৃদ্ধি করার ব্যবস্থার পথ সুগম করা, যা জিডিপির জন্য হবে কল্যাণকর।
লেখক : বাংলাদেশের প্রথম সরকারের কর্মকর্তা। শেয়ারবাজার, ব্যাংক ও বীমা খাত বিশ্লেষক।