দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বাছাই কমিটির সভাপতি হিসেবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ও একজন সদস্য হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির নাম চেয়ে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই দুজন বিচারপতির নাম পাওয়ার পরই আইন অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হবে এবং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি তিনজন কমিশনার নিয়োগ দেবেন, পরে কমিশনারদের মধ্যে থেকে একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন।
জানা গেছে, গত ৩ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর তিন মাস ধরে কমিশন নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। এতে পুরনো অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তকাজ সীমিত আকারে চললেও আইনি সীমাবদ্ধতায় কার্যত দুদকে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় কমিশন পুনর্গঠনের জন্য আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির নাম চেয়ে গত ২৪ মে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরে চিঠি পাঠায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আরিফুল হক মৃদুল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৭ ধারা অনুসারে কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি করতে হবে। ওই বাছাই কমিটি গঠনের অংশ হিসেবে প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতিকে মনোনয়ন দেবেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সভাপতি ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি বাছাই কমিটির সদস্য হবেন। তাই বাছাই কমিটি গঠনের লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতিকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি ও হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
দুদক আইন অনুযায়ী বাছাই কমিটির অপর তিন সদস্য নির্ধারিত আছেন। তারা হলেন বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ও মন্ত্রিপরিষদের সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত সচিব। তবে সবশেষ অবসরে যাওয়া সচিবকে না পাওয়া গেলে বা তিনি অসম্মত হলে তার পূর্বের অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে সদস্য করা যাবে। মন্ত্রিপরিষদের এ রকম কোনো অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে পাওয়া না গেলে বা তিনি অপারগ হলে মন্ত্রিপরিষদের বর্তমান সচিবকে সদস্য করা হবে। বাছাই কমিটি কমিশনের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন ব্যক্তির নাম সুপারিশ করে তার তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবে। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি একজন করে তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন এবং তাদের মধ্যে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেবেন। বাছাই কমিটির পাঁচ সদস্যের মধ্যে চার সদস্যের উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হবে।
জানা গেছে, গত ৩ মার্চ কমিশন পদত্যাগ করার সময়েই দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটিতে (যাবাক) কয়েক হাজার অভিযোগের যাচাই চলছিল। সেগুলো যাচাই শেষে অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হলে কমিশন না থাকায় এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিশনবিহীন মার্চ মাস থেকে প্রায় প্রতিদিনই শত শত নতুন অভিযোগ দুদকে জমা হচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও কয়েকজন উপদেষ্টাসহ তাদের সংশ্লিষ্ট অনেকের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ দাখিল হয়েছে। সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিড়ম্বনা, হয়রানি ও ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়ে দুদকে অভিযোগ দিয়েছেন অনেকেই।
বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, হাসপাতাল, গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান অবৈধ ঘুষ-দুর্নীতি ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকের হটলাইন ১০৬ নম্বরে ফোন করেও প্রতিদিন অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়গুলোতে লিখিত অভিযোগ জমা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাচ্ছে না। নতুন কমিশন নিযুক্ত না হওয়া ও সক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই।
দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিদায়ী কমিশনের অনুমোদিত অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এখতিয়ারভুক্ত কাজ চলমান রয়েছে। অনুসন্ধানকারী ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাদের অনুসন্ধান ও তদন্তের প্রয়োজনে বিভিন্ন দপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। এ ছাড়া নতুন যেসব অভিযোগ জমা পড়ছে, সেগুলো দুদকের যাচাই-বাছাই কমিটি খতিয়ে দেখছে। সেগুলোর বিষয়ে নতুন কমিশন নিয়োগ ও সক্রিয় হওয়ার পর সিদ্ধান্ত হবে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে মামলা দায়ের ও চার্জশিট দাখিলের বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই মামলা দায়ের ও চার্জশিট দাখিল করতে পরবর্তী কমিশনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে এমন ঘটনাও আছে যে, কমিশন না থাকার সুযোগে দুদকের কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তকাজ থামিয়ে রেখেছেন। তারা চাইলে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তা করছেন না।