চারটি বছর মানুষের জীবনকে কতটা বদলে দিতে পারে? রিকার্ডো পেপি এখন ঠিক এই প্রশ্নটারই উত্তর খুঁজছেন।
পেছনের গল্পটা ২০২২ সালের নভেম্বরের। তৎকালীন ইউএস কোচ গ্রেগ বারহাল্টারের একটা ফোন কলেই পেপির বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। কাতার বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ার খবরটি শুনে সহ্য করতে পারেননি ১৯ বছরের তরুণ পেপি; অভিমানে ফোনটাই কেটে দিয়েছিলেন।
এবার ফ্ল্যাশ-ফরোয়ার্ড করা যাক ২০২৬ সালের ২২ মে-তে। ডালাসের রাস্তায় বাবার চালানো গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে বসে ছিলেন পেপি। হঠাৎ বর্তমান কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর একটি হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও মেসেজ এলো—যেখানে লেখা এইবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জন মার্কিন 'যোদ্ধার' নাম। তালিকায় নিজের নাম দেখে পেপি যখন ফোনটি বাবার দিকে বাড়ালেন, 'মেসেজটা দেখাতেই ওনার চোখ দিয়ে পানি চলে এলো," আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলছিলেন পেপি। "বাদ পড়াটা কখনোই আনন্দের নয়। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি সেই ধাক্কাটাকে পজিটিভভাবে কাজে লাগিয়েছি। এটা আমাকে মানসিকভাবে বড় করেছে, পরিণত করেছে।"
সতীর্থদের কাছে 'রিকো' নামে পরিচিত ২৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড এখন মার্কিন আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। আগামী ১২ জুন প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ মিশন শুরুর আগে ফোলোরিন বালোগান এবং হাজি রাইটের সাথে একাদশে জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে আছেন তিনি। ৩৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৩ গোল করা পেপিকে নিয়ে বর্তমান কোচ পচেত্তিনো এক বাক্যে বলে দিয়েছেন, 'পেপি হলো একজন জাত কিলার।'
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচও পেপির এই প্রত্যাবর্তনকে স্যালুট জানিয়েছেন, 'গত বিশ্বকাপে হয়তো ওর থাকা উচিত ছিল। কিন্তু ও দমে যায়নি। ক্লাবে হোক বা জাতীয় দলে, ও কঠোর পরিশ্রম করে গেছে, গোল করেছে। এটাই ওর সেরা সময় এবং এই বিশ্বকাপে থাকাটা ও পুরোপুরি ডিজার্ভ করে।'
মেক্সিকান বংশোদ্ভূত টেক্সাসের এই তরুণের ইউরোপ যাত্রাটা অবশ্য সহজ ছিল না। ২০২২ সালে জার্মানির অগসবার্গে যোগ দিয়ে ১৬ ম্যাচে কোনো গোল পাননি। এরপর ডাচ ক্লাব গ্রোনিংগেনে লোনে গিয়েও ক্লাবকে রেলিগেশন থেকে বাঁচাতে পারেননি।
২০২৩-২৪ মৌসুমে পিএসভি আইন্দহোভেনে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। ইনজুরি যেন পিছু ছাড়ছিলই না! প্রথমে ডান হাতের হাড় ভাঙা, এরপর লিভারপুলের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে ডান হাঁটুর মিনিসকাস টিয়ার —বছরের বড় একটা সময় মাঠের বাইরেই কেটেছে। কিন্তু পেপি তো দমে যাওয়ার পাত্র নন! সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৪ ম্যাচে ১৯ গোল করে জানান দিয়েছেন, তিনি ফুরিয়ে যাননি, 'চার বছর আগের আমি আর আজকের আমি সম্পূর্ণ আলাদা। ইউরোপের বড় দলগুলোর সাথে লড়াই করে এখন আমি মানিয়ে নিতে শিখেছি," আত্মবিশ্বাসী পেপি।'
যার সহজাত ক্ষমতা 'গোল করা'
২০২১ সালে মেক্সিকোকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই পেপি নিজের জাত চিনিয়েছেন। অভিষেকের ম্যাচেই হন্ডুরাসের বিপক্ষে বদলি নেমে গোল ও অ্যাসিস্ট করে দলকে জিতিয়েছিলেন।
পচেত্তিনোর মতে, পেপির সবচেয়ে বড় গুণ হলো ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং শূন্য থেকে সুযোগ তৈরি করা। গত রবিবার সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানের প্রীতি ম্যাচ জয়েও পুলিসিককে দিয়ে একটি দুর্দান্ত গোল করিয়েছেন তিনি।
২০২২ সালে যে তরুণকে বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬-এর ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে সেই রিকার্ডো পেপিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নসারথী। জিরো থেকে হিরো হওয়ার এই গল্পই প্রমাণ করে—ধাক্কা খেলে দমে যেতে নেই, বরং সেখান থেকেই দ্বিগুণ শক্তিতে লাফিয়ে উঠতে হয়।