বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ থামাতে পারে না : হাসনাত আবদুল্লাহ

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে তানিম নূর নির্মাণ করেছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা। গত ঈদুল ফিতরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। কয়েক দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে জোর চর্চা চলছে।  

এরই মধ্যে আলোচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা নিয়ে রিভিউ দিয়েছেন। এনসিপির এ নেতা তার সোশ্যাল মিডিয়ায় রিভিউ প্রকাশ করেন। লেখার শুরুতে তিনি বলেন, “অসুস্থ এক মায়ের জন্য হেলিকপ্টার আনার আবদার শুনে মন্ত্রী মহোদয় অবাক হলেন। বললেন, “একটা মামুলি বিষয়কে আপনি এত বড় কেন করছেন?” গণিতের প্রফেসর রশিদ উদ্দিন উত্তর দিলেন, “মন্ত্রী সাহেব, মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ!” 

বনলতা এক্সপ্রেসের প্রতিটি বগি দুঃখ দিয়ে ভরা বলে মনে করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, “বনলতা এক্সপ্রেস’ মুভিতেও আসলে একই কাজ করা হয়েছে। ছোট ছোট গল্প দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে অনেকগুলো মানুষের জীবনকে, তাদের দুঃখকে। সিনেমাটা দেখার পর বনলতা এক্সপ্রেসকে আপনার আর ট্রেন মনে হবে না, মনে হবে জীবন্ত দুঃখের এক বাহন, যার একেকটা বগি একেকটা দুঃখ দিয়ে ভর্তি। যেমন ডাক্তার আশাবের কথাই ধরুন। ম্যাজিক দেখানো, মায়ের সঙ্গে মজা করা হাসিখুশি ছেলেটাও একটা পর্যায়ে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলল, “না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে...।”  

কয়েকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সঙ্গে সঙ্গে আশাব হয়ে গেল বাংলাদেশের সমস্ত বড় ছেলে, যাদের পেছনে থাকে শৈশবের ট্রমা, বর্তমানজুড়ে থাকে আফসোস, আর হাতে থাকে কিছু অনর্থক ম্যাজিকের কার্ড। দেখতে দেখতে মনে হয়, আমরাও কি অনর্থক কিছু কার্ড আর মুখে ফেক হাসি ঝুলিয়ে বেড়ানো ডাক্তার আশাব নই? নিঃসন্তান কিন্তু ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের, নাকি মাত্র ২৪ বছর বয়সি একমাত্র ছেলের কফিন নিয়ে যাত্রা করা রশিদ উদ্দিন- কার দুঃখ আসলে বেশি?” 

একই ট্রেনে জীবনের আগমনি বার্তা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিদায়ের বিষাদ। এ তথ্য স্মরণ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, হাতে মাত্র এক বছরের জীবন নিয়ে আজিজ যখন স্ত্রী, ছেলে আর মেয়ের ওপর থেকে মায়া কাটাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে জীবনে নতুন যাত্রা শুরু করতে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সদ্য অ্যাডমিশন ক্যান্ডিডেট রুবি। যেই ট্রেনে একজন তরুণ কফিনে চড়ে যাচ্ছে, ঠিক একই ট্রেনে একজন তরুণী জীবন নতুনভাবে শুরু করছে। একটি বিদায়ের দিকে, অন্যটি আগমনের দিকে। শেষ আর শুরুকে একই রেখায় বেঁধে। সেই একই রেললাইনে বসে গণিতের প্রফেসর কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, “হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নাম্বার এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই, ম্যাথ আমার হাতে নাই...।” 

জীবনের সময়কে আলাদা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ম্যাথ কি আসলে আমাদের কারো হাতেই থাকে? না কি আমাদের সকল ম্যাথের সমাধান নিয়ে ওপরে একজন বসে থাকেন, আর আমাদের হিসাব মেলানোর ছুটোছুটি দেখেন? জানাজার নামাজের কোনো আজান হয় না। কারণ জন্মের সময়ই আমাদের কানে আজান দিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের সময় আজান আর মৃত্যুর সময় তার নামাজ। এর মাঝখানের সময়টুকুই আমাদের জীবন।

বনলতা এক্সপ্রেস হচ্ছে একটা পৃথিবী। যে পৃথিবীর এক পাশে সন্তানের কফিন, আরেক পাশে নতুন এক শিশুর জন্ম। যে পৃথিবীর এক পাশে ক্ষমতার দম্ভ, আরেক পাশে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এক পাশে নীলাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট, আরেক পাশে চিত্রার বাড়িয়ে দেওয়া হাত। দিনশেষে বনলতা এক্সপ্রেস আমার গল্প, আমাদের গল্পই বলে মনে করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।   

পড়ে গিয়ে ফের উঠে ছুটে চলাই মানবজাতির ধর্ম বলে মত হাসনাত আবদুল্লাহর। তার ভাষায়, “জন্মের আজান, মৃত্যুর জানাজা, হারানোর দুঃখ কিংবা পাওয়ার আনন্দ-সব নিয়েই আমাদের জীবন। বারবার হাঁটু গেড়ে পড়ে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলাই মানবজাতির নিয়তি। নিয়তি বলেই একটা থেঁতলে যাওয়া ব্যাঙও মাটির সঙ্গে অর্ধেক লেপ্টে থাকা দেহটা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লাফায়, চলে, চলতে থাকে। তাকে থামানো যায় না। এই চলতে থাকাই জীবনের ধর্ম। থেমে গেলেও, কষ্ট পেলেও জীবন, কষ্ট পেতে পেতে সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়ে সুস্মিত শিশিরের মতো সবার মাঝে বারবার ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক বনলতা এক্সপ্রেসের মতো।” 

সবার জন্য প্রশ্ন রেখে হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্য শেষ করেছেন। তিনি বলেন, “এই বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ থামাতে পারে না। কারণ এই ট্রেন মানবজীবনেরই মতো যেখানে স্থবিরতা নয়, কেবল রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। সেই রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে, সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে। যে রূপান্তর শিশুকে প্রৌঢ়ে, বীজকে বৃক্ষে, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে, সেই রূপান্তরকে বন্ধ করে দেওয়ার সাধ্য কার আছে?”