শিশুর জন্য খেলাধুলা কতটা দরকার

শিশুর শারীরিক মানসিক নৈতিক ও বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ কতটা সমৃদ্ধ হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে মা-বাবা কীভাবে লালন করছেন তার ওপরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা না জেনে শিশুর সঙ্গে এমন কিছু আচরণ করেন, যা সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই শিশুর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা যায়, আর কী আচরণ করা যায় না, জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। লিখেছেন শ্যামল আতিক

স্বাভাবিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। খেলার মাধ্যমে শিশুর সৃজনশীলতা, পারস্পরিক যোগাযোগ, পেশি সঞ্চালন দক্ষতা, নেতৃত্বে¡র গুণাবলি, অন্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি যোগ্যতা বিকশিত হয়। প্রায় সব শিশুই লুকোচুরি খেলতে পছন্দ করে। তাই অন্যদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে দিন অথবা আপনি নিজে শিশুর সঙ্গে খেলুন।

কাগজ ভাঁজ করে বা কেটে নৌকা, বিমান, ফুল, পাখি ইত্যাদি আকৃতির জিনিস বানানোও এক ধরনের খেলা (অরিগ্যামি)। এতে শিশুর সূক্ষ্ম পেশির বিকাশ (ঋরহব সড়ঃড়ৎ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ) সুন্দর হয়। কিছু খেলায় মেধার বিকাশ ঘটে অপ্রত্যাশিত মাত্রায়। এর মধ্যে মিছামিছি বা অভিনয় খেলা (চৎবঃবহফ ঢ়ষধু), লোগো বা প্লাস্টিকের ব্লক এবং কাদামাটি নিয়ে খেলা অন্যতম। পরিণত বয়সে শিশুর সঙ্গে দাবা খেলুন। এ খেলায় বুদ্ধি শানিত হয়, শিশু নানা ধরনের কৌশল রপ্ত করতে শেখে, যা তাকে জীবনযুদ্ধে নানাভাবে এগিয়ে রাখবে।

শিশুর জন্য সবচেয়ে উপযোগী হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশে খেলা। দৈহিক বিকাশ ও মানসিক চাপ প্রশমনে প্রাকৃতিক পরিবেশে খেলাধুলা খুব কার্যকর। খেলনা বলতে কারখানায় প্রস্তুতকৃত উপকরণ  বোঝায় না। গাছের পাতা, বালি, পাথর, কাগজের টুকরো, খালি বোতল, গৃহস্থালির ফেলে দেওয়া জিনিসপত্রও উত্তম খেলনা হতে পারে। যে খেলনায় শিশুর সৃজনশীলতা বিকশিত হওয়ার সুযোগ থাকে, এমন খেলনা নির্বাচন করুন। চেষ্টা করবেন ব্যাটারিচালিত খেলনা কম দিতে। এসব খেলনা দিয়ে খেলতে শিশুকে বুদ্ধি খাটাতে হয় না।

প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে খেলাধুলাই সবচেয়ে উত্তম।

কৃত্রিম খেলনায় ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।  প্লেডোর বদলে কাদামাটি দিন। কারণ প্লেডোতে ব্যবহৃত রাসায়নিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অবশ্য ঘরে বানানো প্লেডো দিতে পারেন। এক কাপ লবণ, দুই কাপ আটা এবং পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে নিরাপদ প্লেডো তৈরি করা যায়। সহজাত কারণে শিশু যেকোনো জিনিস মুখে দিয়ে ফেলে। তাই শিশুর খেলনা এত ক্ষুদ্র হওয়া উচিত নয়, যেন সে মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে পারে।

শিশুদের খেলাধুলায় যত কম হস্তক্ষেপ করবেন তত ভালো। কোনো খেলনা দিয়ে কীভাবে খেলবে তা শিশুকেই নির্ধারণ করতে দিন। আপনার অযাচিত হস্তক্ষেপ শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। তবে শিশু আপনার সহযোগিতা চাইলে তখন বলতে পারেন।  আপনি নিজে যখন শিশুর সঙ্গে খেলবেন, তখন তার বুদ্ধির স্তরে নেমে শিশুসুলভ আচরণের মাধ্যমেই খেলবেন। শিশুর সঙ্গে হৈ হুল্লোড় লাফালাফি কিংবা নাচানাচিও করতে পারেন।

শিশুর সঙ্গে এমনভাবে খেলবেন যেন সে বেশিরভাগ সময় জিততে পারে। তবে মাঝে মধ্যে পরাজয়ের অভিজ্ঞতাও দেবেন। হার জিতের মধ্যে দিয়েই তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি করবেন। তা না হলে, ভবিষ্যতে পরাজয়কে সে সহজভাবে মেনে নিতে শিখবে না।  খেলাধুলায় লিঙ্গবৈষম্য করবেন না। ফুটবল ছেলেদের খেলা, পুতুল মেয়েদের খেলা এ ধরনের কথা শিশুদের বলবেন না।

খেলা শেষে শিশুকে খেলনা গুছিয়ে রাখতে উদ্বুদ্ধ করুন। এর ফলে শিশুর মধ্যে দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়। ঘরের নির্দিষ্ট একটি জায়গা শিশুর জন্য নির্ধারিত করে দিন। এখানে শিশুর খেলনা, উপহার সামগ্রী, বই, খাতা, কলম, পেনসিল, আঁকা কোনো ছবি ইত্যাদি থাকবে। প্রতিযোগিতা নয়, খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্মল আনন্দ লাভ। তাই শিশুর খেলাধুলা নিয়ে খুব বেশি সিরিয়াস হবেন না।