মানবাত্মার পরম মুক্তি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের মূল ভিত্তি হলো খোদাপ্রেম। অন্তরকে পার্থিব লোভ-লালসা থেকে মুক্ত না করলে সেখানে ঐশী প্রেমের আলো প্রস্ফুটিত হতে পারে না। হৃদয় যখন সোনা-রুপা কিংবা দুনিয়াবি মোহের মরীচিকা থেকে পবিত্র হয়, ঠিক তখনই সেখানে আল্লাহর মহব্বতের বীজ অঙ্কুরিত হয়। মহান সুফি সাধক ও কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি তার অমর বাণীর মাধ্যমে মানবজাতিকে সর্বদা এই মোহাচ্ছন্নতার বন্দিদশা ভেঙে শাশ্বত প্রেমের পথে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি তার কালজয়ী ফারসি কাব্যগ্রন্থ মসনবি শরিফের প্রথম খণ্ডের ১৯ নম্বর শ্লোকে লিখেছেন-
بند بگسل باش آزاد ای پسر
چند باشی بند سیم و بند زر؟
উচ্চারণ : বন্দে বগছাল, বাশ আজাদ আয়ে পেছার, চান্দ বাশি বন্দে ছিম ও বন্দে জার?
অনুবাদ : হে বৎস! মোহ ও আসক্তির এই শৃঙ্খল ভেঙে ফেলো এবং মুক্ত হয়ে যাও। আর কতকাল তুমি সোনা-রুপার মোহে বন্দি থাকবে?
মাওলানা রুমি এই পঙ্ক্তিতে রূপক অর্থে মানবাত্মাকে জাগতিক মোহের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে সোনা-রুপা বলতে দুনিয়ার যাবতীয় আভিজাত্য, অহংকার, লোভ এবং নশ্বর বস্তুর প্রতি অন্ধ আসক্তিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
সুফি তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের অন্তরের একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা রয়েছে। একই হৃদয়ে যুগপৎভাবে আল্লাহর মহব্বত এবং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহ অবস্থান করতে পারে না। মানব হৃদয় যখন পার্থিব ধন-দৌলতের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তখন তা ঐশী প্রেমের আলোকছটা গ্রহণে অক্ষম হয়ে পড়ে।
মাওলানা রুমি অত্যন্ত স্নেহভরে ‘হে বৎস’ বলে সম্বোধন করে মানুষকে সতর্ক করেছেন, এই নশ্বর জগতের দাসত্ব মানুষের আত্মাকে খর্ব করে।
খোদাপ্রেমের পূর্ণতা অর্জনের প্রধান শর্তই হলো তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি। মানুষ তার অন্তর থেকে যতটুকু জাগতিক লালসা দূর করতে পারবে, তার ভেতর আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তত বেশি তীব্র ও গভীর হবে।