সারা বিশ্বে মৌলবি রুমি নামে পরিচিত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি। ফার্সি ও সুফিধারার সাহিত্যজগতের এক অনন্য নক্ষত্র। বিশ্ববিশ্রুত এই কবির অমর কাব্য মসনভি চিরনতুন ও চিরসজীবতায় ভরপুর। কালের বিবর্তনে আজও প্রাসঙ্গিক রুমি ও মসনভি। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
মুখে মুখে রুমি
শীতকালে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে প্রচুর ওয়াজ মাহফিল হয়। মাহফিলে প্রায়ই বক্তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পরিচিতি তুলে ধরতে সুর করে ফার্সি ভাষায় একটি শের (শ্লোক) আবৃত্তি করেন- ‘মান-না গুঞ্জাম দ্বর জমিনও আসমাঁ, লেকেগুঞ্জাম দ্বর কুলুবে মোমেনাঁ।’ অর্থাৎ আকাশ ও জমিনে নয় আল্লাহর অবস্থান, বরং মুমিনের অন্তরেই খুঁজে পাবে তার স্থান। এটি মাওলানা রুমির বিখ্যাত রচনা মসনভির অমর শ্লোকের একটি।
মসনভি শরিফ
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে মসনভিকে ‘মসনভি শরিফ’ নামে অভিহিত করা হয়। এর দ্বারাই অনুমান করা যায়, মসনভির গ্রহণযোগ্যতা। রহস্যবাদী কবি রুমির অনন্য সাহিত্যকর্ম মসনভির খ্যাতি প্রায় ৮০০ বছর পর আজও প্রখর সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছে বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে। বিশ্বের বহু গবেষক এই কাব্যকে মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে চিন্তা-উদ্দীপক ও দিক-নির্দেশনামূলক বইয়ের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় বলে অভিহিত করেছেন। আল্লামা ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) এবং হেগেলসহ (১৭৭০-১৮৩১) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু দার্শনিক দর্শন বিষয়ে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন রুমির সূক্ষ্ম দর্শন-চিন্তামূলক এই মহাকাব্য থেকে।
রুমির মসনভি সম্পর্কে বলা হয়, ‘মাসনাভিয়ে মানাবিয়ে মৌলবি, হাস্তে কোরআন দ্বর জবানে পাহলভি।’ অর্থাৎ মৌলবির আধ্যাত্মিক মসনভি কাব্যটি হচ্ছে- ফার্সি ভাষার কোরআন। ইরানের প্রখ্যাত মরমি কবি মাওলানা আবদুর রহমান জামি এ মন্তব্য করেছেন। যদিও আসমানি কিতাব কোরআনে কারিমের সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো গ্রন্থ বিশ্বে নেই, তেমন কিতাব রচনা করা মানুষের সাধ্যাতীত। তবুও রুমির মসনভিতে কোরআনের শিক্ষার ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যায় বলে, জামির এই মন্তব্যকে অনেকাংশেই যথাযথ বলা যায়।
মসনভিতে রুমি কোরআনের অন্তত ২ হাজার ২০০টি আয়াতের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন। কিংবা এটাও বলা যায়, কবিতার আঙ্গিকে তিনি আসলে কোরআনের ব্যাখ্যা করেছেন। এ কারণে হিজরি ত্রয়োদশ শতকের বিখ্যাত কবি মোল্লা হাদি সাবজেভরি মসনভিকে কোরআনের তাফসির এবং রুমিকে কোরআনের মুফাসসির বলে উল্লেখ করেছেন।
গল্প ও উপমার সমাহার
রুমির মসনভির সঙ্গে পরিচয় নেই এমন শিক্ষিত মুসলিম ব্যক্তি খুব কমই রয়েছেন। ফার্সি ভাষাভাষী অঞ্চল ছাড়াও ভারত উপমহাদেশের ওয়াজ-নসিহতের মাহফিল কিংবা যেকোনো জ্ঞানগত আলোচনায় মসনভির শ্লোক থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এসব শ্লোক অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নীতি-বাক্য কিংবা প্রবাদ বাক্য হিসেবে। যেমন বলা হয়- ‘সোহবতে সালেহ তুরা সালেহ কুনাদ, সোহবতে তালেহ তুরা তালেহ কুনাদ।’ এই শ্লোকটির বাংলা ভাবার্থ, ‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ।’ এ জাতীয় আরও বহু প্রবাদের উৎপত্তি মসনভি থেকে।
মসনভির মূল লক্ষ্য হলো, মানুষকে নানা বিষয়ে বাস্তবতার শিক্ষা দেওয়া। মানব-জীবনের নানা পর্যায় ও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা। এ জন্য সূক্ষ্মদর্শী রুমি মসনভিতে নৈতিকতা ও প্রশিক্ষণের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রয়োগ করেছেন সুন্দর সুন্দর গল্প ও শিক্ষণীয় প্রচুর উপমা। মানুষকে সুরুচি ও সুশিক্ষার সঙ্গে অভ্যস্ত করতে চাইতেন রুমি। শিক্ষামূলক গল্প ও উপমার মধ্য দিয়ে রুমি মানুষের চিন্তা-চেতনায় এসব সুশিক্ষার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছেন।
অমর কাব্য
মসনভিকে যে যেভাবে ধারণ করেছে, সে সেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে। এখানে রয়েছে- পীর-মুরিদের সবক, গুরু-শিষ্যের ভাবের শিক্ষা, কবির জন্য উপমা, গল্পকারের জন্য চিত্রনাট্য, সমাজ চিন্তকের জন্য চিন্তার খোরাক, কোরআনের ব্যাখ্যা, চিত্তাকর্ষক গল্প ও সতর্কবাণী থেকে শুরু করে মানব জীবনের দিক-নির্দেশনামূলক কাব্যের বিপুল সমাহার। এ জন্য বলা হয়, মসনভি হলো- শিক্ষার পাঠশালা। কোরআন ও হাদিসের নানা শিক্ষা এবং নবী-রাসুলদের কাহিনী এই মহাকাব্যে নানা আঙ্গিকে বহু গল্প আর উপমার শৈল্পিক উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে। আর এ জন্যই মসনভি হয়েছে কালোত্তীর্ণ এক অমর কাব্য।
রুমির মসনভির গল্পগুলোর বিন্যাস ও গাঁথুনি এমনই যে, তা পাঠককে গল্পের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত টেনে নিতে বাধ্য করে। আর তার গল্পের একটা অধ্যায় শেষ না হতেই পাঠক হুমড়ি খেয়ে পড়েন পরের অধ্যায়ে কী হয়েছে তা জানার জন্য। এ বিষয়টাকে অনেকাংশে অনুসন্ধানী সিরিজ গল্প কিংবা শিহরণ-জাগানো রোমাঞ্চকর, রহস্যভরা উপন্যাসের অনিবার্য আকর্ষণের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের এই কবির অমর কবিতার স্পর্শে ফার্সি ভাষা হয়েছে সমৃদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী নন্দিত। ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান কয়েক বছর আগে এক নিবন্ধে লিখেছে, ‘এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার, ৯/১১-এর ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে সর্বোচ্চ বিক্রীত বইয়ের তালিকায় স্থান পায় মৌলবি নামের একজন বিখ্যাত ইরানি কবির ধ্রুপদী কবিতার বই। যিনি কয়েক শতাব্দী আগে ইসলামি শরিয়তের বিধিবিধান শেখানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন।’
ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে মৌলবি বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে এই সময়ের প্রজন্মের কাছে রুমিকে নতুনভাবে পরিচিত করিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছে রুমি ও তার কবিতার প্রতি। দিন দিন তার জনপ্রিয়তা বেড়ে চলছে। তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি এবং ‘বেস্ট সেলিং পোয়েট’ বলা হয়।
রুমির জীবন
জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি আফগানিস্তানের বালখ্ নগরীতে ১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ও মা মুইমিনা খাতুন। রুমি একাধারে ছিলেন কবি, আইনজ্ঞ, বিখ্যাত ইসলামিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক ও অতীন্দ্রিয়বাদী সুফি সাধক। রুমির জন্মস্থান বালখ্ তখনকার সময়ে ফার্সি সংস্কৃতি ও সুফিবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। রুমির বাবা বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ ও অতীন্দ্রিয়বাদী ছিলেন। ১২১৫ থেকে ১২২০ সালের মধ্যে মঙ্গোলরা যখন এশিয়া আক্রমণ করে, তখন রুমির বাবা পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে পশ্চিমাভিমুখে রওনা হন। বিভিন্ন দেশ ঘুরে ইরানের নিশাপুর গেলে বিখ্যাত কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। আত্তার তার দূরদৃষ্টি দ্বারা রুমির প্রতিভা সম্পর্কে বুঝতে পারেন এবং রুমিকে আশীর্বাদ করেন। এর পর পরিবারটি পবিত্র মক্কা নগরীতে হজপালন করে এবং বিভিন্ন শহর ঘুরে অবশেষে বর্তমান তুর্কিতে অবস্থিত কোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বাস শুরু করে। এই কোনিয়াতেই বসে রুমি বেশিরভাগ সাহিত্য রচনা করেছেন। এখানে তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছেন।
গুরু ও শিষ্যের প্রভাব
১২৪৪ সালের কোনো একদিন দরবেশ শামস তাবরিজির সঙ্গে দেখা হয় মাওলানা রুমির। এর পরই তার জীবন বদলে যায়। একজন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষক ও আইনজ্ঞ থেকে রুমি সাধুতে রূপান্তরিত হন। শামস একজন সঙ্গী খুঁজছিলেন, যে তাকে সঙ্গ দেবে। এ কথা শুনে রুমি তাকে জিজ্ঞেস করেন, বিনিময়ে শামস তাকে কী দেবে? শামস বললেন তার শির। তারপর রুমি বলেন, তুমি যাকে খুঁজছ সে কোনিয়ার জালাল উদ্দিন রুমি। রুমি শামস দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন, শামসের মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক ও অতীন্দ্রিয়বাদী হয়ে ওঠেন।
বলা হয়, ১২৪৮ সালের এক রাতে রুমি ও শামস একত্রে বসে কথা বলছিলেন। ওই সময় পেছনের দরজা দিয়ে কেউ শামসকে ডাক দেয়। শামস সেই ডাকে সাড়া দিতে যান, কিন্তু আর ফিরে আসেননি। শামসের শূন্যতা রুমিকে প্রচণ্ডভাবে কষ্ট দেয়। তাকে হারানোর শোকে রুমি লিখেন- ‘দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজি।’
ঐতিহাসিক জুল আলআফলাকির মতে, রুমির শ্রেষ্ঠ বেদনা-বিধুর কবিতাগুলো রচিত হয়েছে শামস তাবরিজিকে হারানোর বিরহ-ব্যথাকে কেন্দ্র করে। রুমির আধ্যাত্মিক গুরু শামস সূর্যের মতোই যেন প্রোজ্জ¦ল হয়ে আছেন প্রিয় শিষ্য রুমির কবিতায়। বাস্তব জগৎ থেকে শামস হারিয়ে গেলেও তাকে চিরকালের জন্য হাজির করে রেখেছেন রুমি তার কবিতায়। এমন গুরুভক্তির দৃষ্টান্ত বিরলই বটে।
গুরু হারানোর পর রুমির সঙ্গী হন পেশায় স্বর্ণকার সালাউদ্দিন জারকুব। তার মৃত্যুর পর রুমির লিপিকার এবং প্রিয় শিষ্য হিসামুদ্দিন চালাবি রুমিকে সঙ্গ দেন। হিসামুদ্দিনের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহে রুমি শুরু করেন মসনভি রচনা। রুমি প্রায় ১২ বছর ধরে ছয় খণ্ডে মসনভি রচনার কাজে নিয়োজিত থাকেন। এটি রুমির লেখা সেরা রচনাগুলোর মধ্যে একটি। এ ছাড়া রুমি অসংখ্য রুবাইয়াৎ ও গজল লিখেছেন। রুমির সাহিত্যকর্ম বেশিরভাগই ফার্সি ভাষায় রচিত হলেও তিনি অনেক কবিতা তুর্কি, আরবি এবং গ্রিক ভাষায়ও রচনা করেছেন।
ইরানের অধ্যাপক ফুরুজানফারের মতে, রুমি তার লেখায় ৭৫ হাজারেরও বেশি বিশেষণমূলক নতুন যৌগিক শব্দ রচনা করেছেন। এর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে তার সৃষ্টিশীল চিন্তা ও নতুন শব্দ রচনার বিস্ময়কর প্রতিভা।
রচনাবলি
কবিতার পাশাপাশি রুমির বেশ কিছু বক্তব্য তার সঙ্গী ও অনুসারীদের দ্বারা লিপিবদ্ধ আকারে প্রকাশ পেয়েছে। ‘ফি মা ফি’ গ্রন্থে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তার প্রায় একাত্তরটি বক্তব্য স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও ‘মজলিস-এ সভা’ গ্রন্থে রয়েছে বিভিন্ন সভায় রাখা রুমির সাতটি বক্তব্য। ‘মাকাতিব’ এ রয়েছে তার ছাত্র, পরিবারের সদস্য, রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ ও অন্য ব্যক্তিদের কাছে লেখা বেশ কিছু চিঠিপত্র।
১২৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে রুমি অসুস্থতাবোধ করতে থাকেন। অসুস্থাবস্থায় রুমি নিজের বেশ কিছু গজল ও কবিতা লিখেন। যেগুলোতে তার মৃত্যুর কথা রয়েছে। ১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে তুর্কির কোনিয়ায় বিখ্যাত এই কবি মৃত্যুবরণ করেন। রুমিকে তার বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। রুমির কবরের এপিটাফটিতে উজ্জ্বল হরফে লেখা রয়েছে, ‘যখন আমি মৃত, তখন আমাকে আমার সমাধিতে না খুঁজে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও।’ নিজেকে পাওয়ার যে স্থানের কথা রুমি উচ্চারণ করেছেন, সেটা শুধু বলার জন্য বলা কিংবা লেখার জন্য লেখা নয়। হৃদয়ে থাকা বিশ^াসের প্রতিফলন ছিল বলেই রুমির দেখা মেলে শান্তিবাদী মানুষের মনে, সুফিদের মজমায় ও সাহিত্যের নানা অলিন্দে।
সমকালীনতা
জ্ঞানসাধকদের মতে, সুখ-শান্তি এমন এক রতœ, যা না থাকলে মানুষের জীবন নরকে পরিণত হয়। প্রশান্তিহীনতা মানুষের অস্তিত্বকে তিলে তিলে অস্থির করে তোলে। আজকের পৃথিবীতে মানুষ বিচিত্র অশান্তি ও সংকটে নিমজ্জিত। তার পরও সবার একান্ত চাওয়া, যেকোনো উপায়েই হোক- হারানো শান্তি ও সুখ পুনরায় ফিরিয়ে আনা। শান্তি ফিরিয়ে আনার পথ সঠিক হোক কিংবা ভুল, দরকার শান্তি। এভাবে সুখ-শান্তি অন্বেষণের উপায় নিয়ে বিশ্বাসগত মতপার্থক্যের কারণে বর্তমান পৃথিবীতে বিচিত্র ফেরকা, মতবাদ ও নানা গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে।
কিন্তু মাওলানা রুমি সেসব মনীষীদের একজন, যিনি সবকিছু ছাপিয়ে তার সমগ্র রচনায় মানুষকে সঠিক জীবনযাপনের পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। শান্তি-সুখ কেন চলে গেল, তা ফিরিয়ে আনার জন্য কী করা উচিত মসনভিতে এ সংক্রান্ত চমৎকার চমৎকার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, রাস্তা দেখিয়েছেন, উপায় বাতলেছেন। মসনভি রচনার ক্ষেত্রে রুমির লক্ষ্য ছিল, পাঠকদের নৈতিক এবং মানবিক মূল্যবোধের দিকে পরিচালিত করে উন্নত জীবনযাপনের দিকনির্দেশনা দেওয়া। তার লক্ষ্যে তিনি যে সফল, ৮শ বছর পরও তার কবিতা ও জীবন নিয়ে আলোচনা করাটাই এর প্রমাণ বহন করে।
রুমির দৃষ্টিতে মানুষের অশান্তির অনেকগুলো কারণের একটি হলো, পার্থিব স্বার্থের মোহ। বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, অশান্তি হলো- বাহ্যিক কর্মফল এবং সুযোগ-সুবিধা আর শান্তি সমার্থক। তাই তারা জীবনের কল্যাণমূলক বিচিত্র সরঞ্জাম ও উপায়-উপকরণ জোগাড়ে ব্যতিব্যস্ত থাকেন- যাতে শান্তি লাভ করতে সক্ষম হন। কিন্তু এগুলো যে জীবনে প্রশান্তি আনতেই কেবল ব্যর্থ তা নয় বরং মানুষকে আরও বেশি অশান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। মৌলবি রুমির দৃষ্টিতে প্রকৃত প্রশান্তি হলো, স্বার্থের মোহ হ্রাস করার মধ্যে। তাই মানুষের উচিত, পার্থিব স্বার্থের প্রতি মোহ সৃষ্টির কারণগুলোকে যথাসম্ভব নিজের মধ্য থেকে দূর করা। কেননা পার্থিব স্বার্থের প্রতি মোহ হলো- ধারালো ছুরির মতো, যে ছুরি মানুষের অন্তরাত্মাকে নিরন্তর ক্ষতবিক্ষত করে।
সুফিদের মতে, যে সত্যের আলোয় অবগাহন করে নিজেকে পবিত্র করা যায় এবং সেই আলোই হচ্ছে- খোদাপ্রেম। আর এই প্রেম সত্যই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে রুমির সমগ্র কবিতায়। যার আলোকবিভা আজও দৃশ্যমান ও প্রাসঙ্গিক মানবজীবনের পরতে পরতে।
