স্বপ্ন নয়, হিসাবও জরুরি

উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প আমরা সাধারণত এক রকমভাবে শুনি একজন মানুষ শূন্য থেকে শুরু করে বিশাল কিছু গড়ে তুললেন। এই গল্পে অনুপ্রেরণা আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গল্পের ভেতরে আরও কিছু স্তর থাকে, যেগুলো অনেক সময় সামনে আসে না। সেই স্তরগুলো বুঝতে পারলেই ‘বুঝে-শুনে উদ্যোক্তা হওয়া’ কথাটার আসল অর্থ পরিষ্কার হয়।

ইলন মাস্কের কথা ধরলে দেখা যায়, তার বাবা দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্পত্তি ও প্রকৌশল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে প্রযুক্তি, ব্যবসা আর অর্থ এই তিনটি বিষয়ে অপরিচিত ছিল না। এর ফলে নতুন কিছু শুরু করার সাহস যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি ব্যর্থ হলেও পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

জেফ বেজোসের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। তিনি যখন তার অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন, তখন তার বাবা-মা কয়েক লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। এই অর্থটা শুধু টাকা নয়, বরং একটি বড় ভরসা যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন ধারণা পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যায়। অনেকের কাছে এই সুযোগটাই সবচেয়ে কঠিন।

বিল গেটসের গল্পেও পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার মা করপোরেট জগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে কাজ করতেন। এই সূত্রেই খুব অল্প বয়সে তিনি বড় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান। বলা হয়, এই সংযোগই তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার দরজা খুলে দেয়, যা পরে তার প্রতিষ্ঠানের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।

মার্ক জাকারবার্গ এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হতো। তার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ছিলেন এবং ছেলের আগ্রহ বুঝে ছোটবেলাতেই তাকে কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিং শেখার সুযোগ করে দেন। এমনকি শুরুর দিকে তার কাজ এগিয়ে নিতে পারিবারিক আর্থিক সহায়তাও ছিল।

ট্র্যাভিস কালানিকের পরিবারও সচ্ছল ছিল। তার বাবা ছিলেন প্রকৌশল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং মা বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ করতেন। ফলে ব্যবসা ও বিপণনের ধারণা তার কাছে একেবারে নতুন ছিল না। এই পরিবেশ তাকে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

ইভান স্পিগেল লস অ্যাঞ্জেলেসের এমন এক এলাকায় বড় হয়েছেন, যেখানে ধনী ও প্রভাবশালী মানুষের বসবাস। তার বাবা-মা দুজনেই সফল আইনজীবী ছিলেন। এর ফলে তিনি এমন একটি সামাজিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে যোগাযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং সুযোগ সবকিছুই তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য।

জ্যাকলিন মার্সের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সরাসরি। তিনি একটি বিশাল পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকারী। তবে শুধু উত্তরাধিকার পাওয়াই নয়, সেই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা ও আরও বড় করে তোলার কাজেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অর্থাৎ তার শুরুটা অনেক এগিয়ে থেকেও, সফলতা ধরে রাখতে তাকে নিজস্ব দক্ষতাও প্রমাণ করতে হয়েছে।

এই উদাহরণগুলো দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় সফল উদ্যোক্তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই পরিবার একটি শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়। এই ভিত কখনো অর্থ দিয়ে, কখনো যোগাযোগ দিয়ে, কখনো শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তৈরি হয়। এর ফলে তারা ঝুঁকি নিতে পারে একটু বেশি নির্ভয়ে।

এর মানে এই নয় যে, যাদের এমন সহায়তা নেই তারা উদ্যোক্তা হতে পারবে না। বরং এর মানে হলো সবার শুরুর অবস্থান এক নয়। তাই নিজের অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উদ্যোক্তা হওয়ার আগে তাই নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখা দরকার। আমার ব্যর্থ হলে কী করার সুযোগ আছে? আমার হাতে কতটা সময় ও সঞ্চয় আছে? আমার চারপাশে কি এমন মানুষ আছে, যারা আমাকে সমর্থন করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করে দেবে, কোন পথে এগোনো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।

স্বপ্ন দেখা জরুরি, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু সাহস দেখানো নয়, বরং সচেতনভাবে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করা।

* ছবি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হয়েছে