শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় আজ রবিবার হওয়ার কথা রয়েছে। নির্মম এ ঘটনার ২০ দিন ও বিচার শুরুর মাত্র সাত দিনের মধ্যে চাঞ্চল্যকর মামলাটির রায় হতে যাচ্ছে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও দোষীদের সাজা নিশ্চিত করার এ চেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানাই। দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে দেশে ৩০৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৩ জন; এর মধ্যে রামিসাসহ ১৮ বছরের নিচে কমপক্ষে ৫৭ কন্যাশিশু রয়েছে। বিভিন্নভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৭৬ নারী-শিশু; যার মধ্যে শিশু ৪২ জন। নারী-শিশুদের মধ্যে ১৭ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে অন্তত ২১৫ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে গত ২০ মে পর্যন্ত মাত্র চার মাসে কমপক্ষে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর খুন হয়েছে কমপক্ষে ১৭ শিশু। সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে সব মিলিয়ে এ চিত্রটি ভয়াবহ। এতে আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন।
আমাদের উদ্বেগের কারণ হলো, নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকা-সহ কিছু ঘটনা আলোচনায় এলে গ্রেপ্তার, তদন্ত ও বিচারে গতি দেখা যায়। অন্যদিকে এমন অসংখ্য ঘটনার বিচার শুরু হতেই মাসের পর মাস, আর দোষী ব্যক্তি সাজা পেতে বছরের পর বছর চলে যায়। হত্যা ও ধর্ষণের তদন্ত ও বিচার কত দিনে করতে হবে, তা আইনে সুনির্দিষ্ট করে বলা আছে। কিন্তু সেভাবে তদন্ত ও বিচার এগোয় না। নারী-শিশু ধর্ষণ কালেভদ্রে আলোচনায় এলেও, ছেলে-শিশু বলাৎকার নিয়ে সমাজে বলতে গেলে কথাই হয় না। যদিও অনেক ছেলে-শিশু বলাৎকারের শিকার হয়।
শিশু রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গেছেন। হয়তো এ কারণে মামলাটির বিচার দ্রুত এগিয়েছে। তিনি পরিবারকে সহানুভূতি জানিয়েছেন, সুবিচার নিশ্চিত করার আশ^াস দিয়েছেন। সেজন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু তিনি না গেলে এ মামলাটিও অন্য অনেক মামলার মতো কার্যতালিকায় ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ত না, এটা কি নিশ্চিত করে বলা যায়? অতীতেও অনেক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আলোড়ন তৈরি করেছে। সেসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে সরকার, পুলিশ ও বিচার বিভাগ কি একটু খতিয়ে দেখবে?
জনমনে ধারণা যে, কোনো ঘটনা আলোড়ন না তুললে, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল না হলে এবং রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের নজরে না এলে সমাধান পাওয়া দুরূহ। তাহলে নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের মতো অন্য যেসব ঘটনার মামলায় তদন্ত ও বিচার এগোচ্ছে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে কি বিষয়টি এমন দাঁড়ায় যে কেবল সরকারপ্রধানের নজরে এলেই বিচার মিলবে, নচেৎ নয়? এটা কি রাষ্ট্রব্যবস্থার অস্বাভাবিকতা ফুটিয়ে তোলে না? বাস্তব কারণেই সরকারপ্রধানের পক্ষে সারা দেশে এত ঘটনায় নিজে যাওয়া এবং সাড়া দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। এ কারণে আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যাই, যেখানে পরিবার ও সমাজ নারী-শিশুর নিরাপত্তায় নিজ নিজ নজরদারি জারি রাখবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ এবং বিচার বিভাগ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে, যাতে কেউ ধর্ষণ এবং হত্যাকা- ঘটানোর সাহস না করে।
আমরা চাই প্রতিটি নারী, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সব শিশু নিরাপদ থাকবে। একজনও ধর্ষণের শিকার হবে না, খুন হবে না। আর কেউ যদি ধর্ষণের শিকার হয়, খুন হয়, তাহলে আমরা সব ঘটনার শুধু ত্বরিত তদন্ত ও দ্রুত বিচার নয়, দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাইব।