বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাবে সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে। উদ্যোগ চমৎকার, খবরটাও আনন্দের। উদ্যোগ চমৎকার হলেও নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য অবধারিতভাবে এই পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করে উদ্বেগ, উঁকি দেয় সন্দেহ, তৈরি হয় সংশয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বহু বছর ধরে নানা অভিযোগ, একটি বড় অভিযোগ বা আফসোস হচ্ছে এই দেশে মানুষের স্বাস্থ্য কখনো রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে ছিল না। খাতটিতে বরাদ্দ কম ছিল বলে অভিযোগ ছিল এতদিন। অবশেষে সেই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৩৫ হাজার ২৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিবেচনা রয়েছে সরকারের। চলতি অর্থবছরের মূল বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বরাদ্দ বাড়লেই কি দেশের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র বদলে যাবে? প্রান্তিক মানুষ পাবেন স্বাস্থ্যসেবা? সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে? দুর্নীতি কমবে? বন্ধ হবে লুটপাট?
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ অবহেলার শিকার। বরাদ্দ ছিল সবসময়ই অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় গত দুই দশক ধরে জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। ২০২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল, জিডিপির মাত্র ০.৭৪ শতাংশ। এই অপ্রতুল বিনিয়োগের ফল স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ, বিরূপ, অনিবার্যভাবেই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থ স্বাস্থ্য খাত। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি অন্যতম সর্বোচ্চ হার। অসুস্থ হওয়া মানে বহু পরিবারের জন্য ঋণগ্রস্ত হওয়া, জমি বিক্রি করা বা দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়া। দীর্ঘসময় ধরে এই অব্যবস্থা চলছে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণে দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স সংকট এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ডায়াবেটিস-ক্যানসার- হৃদরোগসহ অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাম পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা কতটা গভীর। গবেষণায় দেখা গেছে, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতির কারণে লাখো শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সমস্যা কেবল বরাদ্দের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দূরদর্শী কার্যকর পরিকল্পনার অভাব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২২.১৫ শতাংশ। অন্য এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ তার বরাদ্দের মাত্র ৬.৫৯ শতাংশ এবং চিকিৎসা শিক্ষা বিভাগ মাত্র ২.৯৮ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। অর্থাৎ অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তা কাজে লাগানোর সক্ষমতা ভয়াবহভাবে দুর্বল।
এটা প্রায় প্রতিষ্ঠিত এখন, অনেকেই বারবার বলেছেন কথাটা। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘অর্থের অভাব’ নয়, বরং সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘সুশাসনের অভাব’। প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন যথার্থভাবে হয় না। যন্ত্রপাতি কেনা হয়, কিন্তু ব্যবহার হয় না। হাসপাতাল ভবন নির্মাণ হয়, কিন্তু চিকিৎসক নেই। আধুনিক ভবন দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ সেখানে রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায় না। রাজধানীর বাইরে গেলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র চোখে পড়ে। অসংখ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ খালি। কোথাও এক্স-রে মেশিন নষ্ট, কোথাও অপারেশন থিয়েটার অচল, কোথাও অ্যাম্বুলেন্স নেই। বহু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ, ক্রয় এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্রমেই অনাস্থার জায়গায় পরিণত হচ্ছে। গ্রামের একজন দরিদ্র মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সেবা পান না, তখন রাষ্ট্রের উন্নয়ন সূচকের গল্প তার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য খাতবিষয়ক বিভিন্ন বিশ্লেষণে বারবার বলা হয়েছে, বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয়ের দক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে যে, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য বা সংগঠনগত পরিচয় মেধা ও দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্য খাতে পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় হাসপাতাল পরিচালনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অর্থায়নকে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে এনে দক্ষতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি কেনা নয় বরং স্বাস্থ্য প্রশাসনের সংস্কার, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠন, মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচন এবং স্থানীয় পর্যায়ে অধিক ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বরাদ্দ দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এটি প্রমাণ করে যে, নীতিনির্ধারকরা অন্তত সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। অসুস্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সুস্থ করতে শুধু টাকা নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। কারণ স্বাস্থ্য খাত কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী প্রধান, সামাজিক উন্নয়ন আরডিআরএস বাংলাদেশ
