অতিরিক্ত বিনিয়োগ, লাইন নির্মাণ করে বসে থাকার পরও বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত না হওয়ায় লাভের কোম্পানিতে লোকসান হানা দিয়েছে। এই দুরবস্থা এখন দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের একমাত্র সরকারি বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানিটি বছরের পর বছর লোকসান করলে বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারাবে। বিনিয়োগ না পেলে সেই জায়গা দখল করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ব্যয় বাড়লে ভর্তুকি দিয়ে এ খাতকে সচল রাখতে হবে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি)-তে গত বছর ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। নতুন নতুন লাইন নির্মাণের কারণে ক্রমান্বয়ে এই দেনার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোম্পানিটির একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ ও ২০৩০-৩১ এই ছয় বছরে কোম্পানিটিকে ৩৫ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা সুদে-আসলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত বিনিয়োগে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়াতে কোম্পানিটি ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রকল্প করার জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই সংকট থেকে কোম্পানিটিকে বের করা সম্ভব না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো সঞ্চালনেও বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রয়োজন পড়বে।
গত কয়েক বছর ধরে সঞ্চালন খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখা গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সঞ্চালন লাইনেও বেসরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নীতিমালা করে। কিন্তু পিজিসিবি অপেক্ষাকৃত কম বিদ্যুৎ সঞ্চালন হয় এমন লাইনগুলো ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করে। এতে বেসরকারি কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত আর লাইন নির্মাণ করতে এগিয়ে আসেনি।
কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির গ্রিড সাবস্টেশনে পৌঁছে দেয়। এই গ্রিড সাবস্টেশনগুলো সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
সারা দেশে জালের মতো এই গ্রিড সাবস্টেশনগুলো সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এভাবে কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বিতরণ সাবস্টেশনে পৌঁছে। সেখান থেকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের আঙিনায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান এবং কেন্দ্রের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে সঞ্চালন কোম্পানি। এজন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সঞ্চালনে একটি চার্জ দেওয়া হয়। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সম্প্রতি এই চার্জ প্রতি কিলোওয়াটে (ইউনিট) ০.৩৮৮৬ টাকা নির্ধারণ করেছে।
সঞ্চালন খাতে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে কীভাবে ব্যয় বাড়বে, এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটি তাদের বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চালন খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৩ সালে ভারত বিদ্যুৎ আইন সংস্কার করে বেসরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। এরপর ২০০৯ সালে ট্যারিফ বেজড কম্পিটিটিভ বিডিং (টিবিসিবি) মডেলে বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। টিবিসিবি হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে সরকার বা নির্ধারক সংস্থা আগে থেকে ঠিক করে দেয় না, যেকোনো সঞ্চালন প্রকল্পের জন্য কত টাকা খরচ বা কত রিটার্ন (বিনিয়োগ ফেরত) দেওয়া হবে। বরং বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি সংস্থা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরপ্রস্তাব জমা দেয়। যে কোম্পানি সবচেয়ে কম খরচে প্রকল্পটি তৈরি ও পরিচালনা করার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হয়, তাদের কাজ দেওয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পদ্ধতিকে লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কেবলমাত্র ভারতের সরকারি কোম্পানি যখন সব বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে ছিল, ২০০০ সালের আগে তখন ভারতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সঞ্চালন ব্যয় ছিল ০.১০ রুপি। এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৬৩ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রার হিসেবে ০.৮৫ টাকা। সেখানে সরকারের হাতে সঞ্চালন লাইন থাকায় বাংলাদেশে এই ব্যয় ভারতের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
গত ১৩ বছরের মধ্যে দেখা গেছে, শুরুর দিকে ২০১২-১৩ সালে লোকসান করেছে পিজিসিবি। এর ঠিক আগের বছর এই কোম্পানি ১০১ কোটি টাকা লাভ করে। কিন্তু ২০১৩-১৪ সালে এসে কোম্পানিটি লোকসান করে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ধারাবাহিকভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১৮ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৫৭ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১০ কোটি টাকা লোকসান করে কোম্পানিটি।
কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেন, কিছু বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আমরা বসে রয়েছি, কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত না হওয়াতে আমাদের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সঞ্চালন লাইনের কাজ একই সময়ে শেষ হওয়া প্রয়োজন হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা হয়নি। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসার কথা ছিল ২০২৩ সালে। সেই অনুযায়ী আমরা সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করি। কিন্তু এখনো কেন্দ্রটি উৎপাদনে না আসায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আয় না হলেও ঋণের সুদ বাড়ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিতরণ সংস্থা যে পরিমাণ লোড বা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে বলে ধারণা করে, সব সময় সেই অনুযায়ী বাড়ে না। এতে করেও কোম্পানি লোকসান করে। পিজিসিবি সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিতরণ কোম্পানিগুলো বলেছিল তাদের লোড বৃদ্ধি পাবে ১০ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে বেড়েছে ১.৯৩ শতাংশ। এর পরের বছর ২০২০-২১ সালে ৮.৩৩ শতাংশের বিপরীতে বেড়েছে ১২.২১ শতাংশ, একইভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯.০৯ ভাগের বিপরীতে ৬.০৬ ভাগ, ২০২২-২৩-এ ৬.৬৩ শতাংশের বিপরীতে ৪.৪২ শতাংশ, ২০২৩-২৪-এ ৫.২৬ শতাংশের বিপরীতে ১১.১৬ শতাংশ, ২০২৪-২৫-এ ৫.৪৬ শতাংশের বিপরীতে ৬.৭৪ শতাংশ এবং গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৬.০৫ শতাংশ চাহিদার প্রক্ষেপণের বিপরীতে বেড়েছে ৬.২৯ শতাংশ।
কোম্পানিটি তাদের একটি প্রতিবেদনে বলছে, গত ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কোম্পানিটি গ্রিড লাইন এবং সাবস্টেশন নির্মাণের বেশির ভাগ উপকরণ বাইরে থেকে আমদানি করে। ডলারের দাম বৃদ্ধি পেলে কোম্পানিটির প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিতরণ কোম্পানি যেভাবে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ দেয়, আমরা সেভাবে আমাদের সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন প্রস্তুত করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে সেই পরিমাণ চাহিদা বৃদ্ধি পায় না। এতে করে আমরা অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে বসে থাকি। যে বিনিয়োগ থেকে কোনো রিটার্ন আসে না। অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে আমাদের ৩ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও তাই। এখানে আমরা লাইন নির্মাণ করে বিনিয়োগ করে বসে থাকার পরও বিদ্যুতের সঞ্চালন শুরু হয়নি।
জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন খাত বেসরকারিকরণের আগে এভাবে লোকসান দেখানো হতো। বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শে ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে আমাদের বিদ্যুৎ খাত বেসরকারিকরণ শুরু হয়। তখন আমরা বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী হিসেবে বলেছিলাম, এক দিন এত ভর্তুকি দিতে হবে যাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা বলেছিলাম, বেসরকারি করা মানেই হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা তাদের দিয়ে দেওয়া। আজকে এত বছর পরে এসে আমাদের সেই কথা ফলছে। এখন সরকার বলছে, প্রতি বছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া তাদের জন্য কষ্টকর। এভাবে বিদ্যুতের সঞ্চালন খাতে লোকসান দেখিয়ে যদি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে এক সময় সঞ্চালন খাতও বেসরকারি কোম্পানির হাতে চলে যাবে। এতে আমাদের বিদ্যুতের সঞ্চালন ব্যয়, যেটা ইউনিট প্রতি ৪০ পয়সার নিচে এখনো, সেটা ভারতের মতো রাতারাতি ৮০ পয়সা হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এখন পিজিসিবি যাতে লোকসান না করে এমন ব্যবস্থা নেওয়া ভালো, নাকি বেসরকারিকরণ করে এই খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে সরকারের ভর্তুকি বৃদ্ধি ভালো তা সরকারকে নির্ধারণ করতে হবে।