প্রত্যাশা ও বাস্তবায়নের চাপে অর্থমন্ত্রী

অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন অর্থবছর ২০২৬-২০২৭ সালের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে আজ থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। বাজেটের আকারের ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকনির্ভরতা ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং সময়ের সঙ্গে অর্থের অপচয় রোধ, দক্ষতা, প্রকল্পের যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকরা। অপরদিকে আসন্ন বাজেটে সরকার কালো টাকা সাদা করার বিষয়টিকে দুর্নীতিসহায়ক সুযোগ প্রদান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১১ জুন সংসদে সরকারের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জুন মাসজুড়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতের বরাদ্দ যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ৩০ জুন সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস হতে পারে। বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা এবং বাস্তবায়নের চাপ দুটিই রয়েছে অর্থমন্ত্রীর ওপর। এখন দেখতে হবে তিনি সেটা কীভাবে সামলান।

এদিকে গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমপি। সভায় চলতি (২০২৫-২৬) ও নতুন অর্থবছরে সরকারের আয়-ব্যয়, কর কাঠামো, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, ঘাটতি বাজেট, মূল্যস্ফীতি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, খাল কাটা কর্মসূচি এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বা ব্যয়ের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এ জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্র ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে ৬ লাখ ৪ হাজার টাকা, করবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আসবে ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং নন এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পরেও বাজেটের আকারের তুলনায় ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি। ঘাটতি মিটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে। এবারের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া এবারের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ৩ লাখ কোটি টাকা। 

বাজেটের মাধ্যম ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হিসেবে দেখছে সরকার। যা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যাত্রায় কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে। এই ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতির গণতন্ত্রায়ণ (ইকোনমিক ডেমোক্রাটাইজেশন), যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। এক্ষেত্রে দলটি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’ প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে।

সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি ৩ লাখ কোটি টাকা ঠিক করেছে। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবিত এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্প সুপারিশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ৮০টি এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পাঁচ বছরের পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে এডিপিকে পাঁচটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার। এতে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাজেট প্রণয়ন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি মানুষের কথা চিন্তা করেই আগামীর বাজেট দেওয়া হচ্ছে। বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। একই সঙ্গে বাজেটের সুফল যাতে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

অতীতে দেশের অর্থনীতিকে যে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে পরিচালিত করা হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে এখন উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন সেমিনারে অর্থমন্ত্রী বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে কর্মসংস্থান ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। যেজন্য নতুন বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাবে। তার মতে, সরকার এমন একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে যাচ্ছে, যেখানে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা আস্থার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারবেন। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক গতি আরও শক্তিশালী হবে।

তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অতীতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের খেসারত দিচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন। তিনি জানান, অতীত সমস্যার প্রভাব বিভিন্ন খাতে রয়ে গেলেও সরকার ধারাবাহিকভাবে সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে সরকারের প্রতিশ্রুতি, বাজেট প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক ও গবেষকরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি মস্তবড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে যত পরিকল্পনাই করা হোক ব্যর্থ হতে হবে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য তা অবাস্তব পরিকল্পনা। পাশাপাশি বিদেশি ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকনির্ভরতা মূল্যস্ফীতি ও সুদ হারকে উৎসাহিত করবে। এ ছাড়া বিদেশি ঋণের যে আশা করা হচ্ছে সেখান থেকে ৮০ বা ৯০ হাজার কোটি টাকাও যদি পাওয়া যায়, তাহলে বলতে হবে সরকার ভালো করেছে। সাধারণত সরকার গতানুগতিক অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করে থাকে। নতুন সরকার অবশ্য কিছু পরিবর্তন আনার কথা বলছে। যদি তেমন কিছু হয়, তবে ভালো। তবে বাজেটের যে আকার শোনা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব রয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাজেটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে সফলতার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রত্যাশা হচ্ছে স্বস্তির বাজেট। এই মুহূর্তে জনগণ উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রত্যাশা করে না। বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবার মধ্যে এখন বড় সংকট আস্থার সংকট। বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট দূর করা জরুরি। বাজেটের ক্ষেত্রে বড় সংকট বাস্তবায়নের সংকট। বাস্তবায়নের এই সংকট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দূর করা যাবে না।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের বাজেটের তিনটি চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। সেটি হলো ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে সচল করা। দ্বিতীয়ত, বাজেটের আকারের প্রেক্ষিতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্র এবং ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকনির্ভরতা এবং তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জ্বালানি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এ তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল থাকতে হবে। ফলে এমন বাজেট দিতে হবে, যা বাস্তবায়নযোগ্য হয়। ফলে নতুন অর্থবছরে প্রত্যাশা হলো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও স্বাবলম্বী অর্থনীতি গড়ে ওঠা।

এদিকে বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখার বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আবাসন খাত ব্যবসায় স্থবিরতা দূর, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অজুহাতে দুর্নীতিসহায়ক সুযোগ প্রদান করা সরকারের জন্য আত্মঘাতী। যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করারই নামান্তর। এ সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে হবে।