মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত

একজন বৃদ্ধ মা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। শরীরের শক্তি ফুরিয়ে গেছে বহু আগেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার প্রয়োজন ছিল একটু সঙ্গ, দুটো মমতার কথা। কিন্তু সেই মা মৃত্যুর পর আলোচনায় এলেন। এ ঘটনায় তার নিথর দেহের চেয়ে বেশি দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে আমাদের সামাজিক বিবেকের পচন। সম্প্রতি নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, বেদনা ও হতাশার ঢেউ উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এ কেমন সন্তান? এ কেমন সমাজ? কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি আরও গভীর। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের জান্নাতকে চিনতে ভুলে গেছি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ (সুনানে নাসায়ি)

হাদিসটি আমরা অসংখ্যবার শুনেছি। বক্তৃতায় শুনেছি, বইয়ে পড়েছি, দেয়ালে লিখেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছি। কিন্তু বাস্তবে কী করা হচ্ছে? যিনি জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম, তাকে একাকী ফেলে রাখা হচ্ছে। এ যেন এমন, অবহেলায় বেহেশত পড়ে আছে আস্তাকুঁড়ে।

ইসলাম এমন ধর্ম, যেখানে মহান আল্লাহ নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার অধিকারের কথা বলেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তার ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উহ পর্যন্ত বলো না, তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৩)

লক্ষ্য করুন, এখানে শুধু খাবার দেওয়ার কথা বলা হয়নি। শুধু ভরণ-পোষণের কথাও বলা হয়নি। বলা হয়েছে সম্মান দিতে, কোমল ভাষায় কথা বলতে, ভালোবাসা দিতে। কারণ বৃদ্ধ বয়সে মানুষ অর্থের চেয়ে বেশি চায় আপনজনের উপস্থিতি। একসময় যে মা সন্তানের জ¦রের রাতে ঘুমাতেন না, আজ তিনি নিজের অসুস্থতার কথা বলার মানুষ খুঁজে পান না। যে মা সন্তানের জন্য নতুন কাপড় না কিনে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিতেন, সেই মা বার্ধক্যে এসে সন্তানের ব্যস্ততার তালিকায় জায়গা পান না। এ এক নির্মম বাস্তবতা।

আজকের সমাজে অনেকেই মনে করেন, বাবা-মায়ের খরচ চালিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ। ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে, বাসা ভাড়া দিয়ে কিংবা একজন পরিচর্যাকারী রেখে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু ইসলাম এমন শিক্ষা দেয় না। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ তৃতীয়বারও একই উত্তর দিলেন। এরপর বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি)

কেন তিনবার মা? কারণ একজন মা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। গর্ভধারণের কষ্ট, সন্তান জন্মদানের যন্ত্রণা, দুধপান করানো, লালন-পালন, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, আত্মত্যাগ, সব মিলিয়ে মা এমন এক ভালোবাসার নাম, যার প্রতিদান দেওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

মায়ের ত্যাগের কোনো সীমা নেই এবং ইসলামে মায়ের এই কষ্টকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় ২ বছরে। সুতরাং আমার ও তোমার মা-বাবার শুকরিয়া আদায় করো। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।’ (সুরা লুকমান ১৪) এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা তার নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার কঠোর তাগিদ দিয়েছেন। কারণ সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য একজন মা যে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন, তা পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু নুর জাহান বেগমের উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা মায়ের সেই গর্ভধারণের কষ্ট, সেই বিনিদ্র রজনী যাপনের ত্যাগের কথা ভুলে গিয়ে জঘন্য আচরণ করেছে। তারা মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন না করে আল্লাহর দেওয়া নির্দেশকে অমান্য করেছে, যা তাদের ইহকাল ও পরকালকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এক ব্যক্তিকে দেখেছিলেন, তিনি নিজের মাকে পিঠে বহন করে কাবা শরিফ তাওয়াফ করাচ্ছেন। এরপর লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি মায়ের হক আদায় করতে পেরেছি? হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেছিলেন, না, তার প্রসববেদনার একটি দীর্ঘশ্বাসের প্রতিদানও তুমি দিতে পারোনি। এটাই মায়ের মর্যাদা।

নুর জাহান বেগমের ঘটনা সত্যিই যদি অবহেলার প্রতীক হয়ে থাকে, তবে এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক নৈতিক পরাজয়। কারণ সন্তানদের আমরা ডাক্তার বানিয়েছি, প্রকৌশলী বানিয়েছি, বড় বড় কর্মকর্তা বানিয়েছি, কিন্তু মানুষ বানাতে পারিনি। ডিগ্রি বেড়েছে, মানবিকতা কমেছে। আয় বেড়েছে, মমতা কমেছে। বাড়ি বড় হয়েছে, পরিবারের হৃদয় ছোট হয়েছে। ইসলাম এমন মানুষ তৈরি করতে চায় না। ইসলাম এমন সন্তান চায়, যে বৃদ্ধ মায়ের কাঁপা হাত ধরে। যে মায়ের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারে। যে মায়ের জন্য সময় বের করে।

আজ আমরা বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়তে দেখছি। একাকী বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়তে দেখছি। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে দেখছি। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে রাখা উচিত, বৃদ্ধ মা-বাবার দীর্ঘশ্বাসেরও হিসাব আছে। তাদের অশ্রুরও হিসাব আছে। কেয়ামতের দিন পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা সামাজিক পরিচয় কোনো কাজে আসবে না। তখন প্রশ্ন করা হবে দায়িত্ব সম্পর্কে, আমানত সম্পর্কে, সম্পর্ক সম্পর্কে।

একদিন আমরা সবাই বৃদ্ধ হব। আজ যে সন্তান মায়ের খোঁজ নেয় না, কাল সেও হয়তো নিজের সন্তানের অপেক্ষায় থাকবে। জীবন এমনই। সময় ঘুরেফিরে আসে। মানুষ যা বপন করে, তাই কাটে।

নুর জাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের মুখ দেখতে পাচ্ছি। আমরা বুঝতে পারছি, আধুনিকতার দৌড়ে কোথাও যেন আমরা মাকে হারিয়ে ফেলেছি।

তবু এখনো সময় আছে। যদি মা বেঁচে থাকেন, তবে তার যতœ নিন। তাকে সঙ্গ দিন। তার জন্য কিছু সময় বের করুন। কারণ পৃথিবীতে অনেক কিছু হারিয়ে গেলে ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মা হারিয়ে গেলে আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। জান্নাতের সন্ধানে আমরা কত পথ পাড়ি দিই। কত দোয়া করি। কত আমল করি। অথচ সেই জান্নাত ঘরেই আমাদের অপেক্ষায় থাকে। বৃদ্ধ, ক্লান্ত, নীরব মায়ের রূপে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমরা উপলব্ধি করতে পারি না।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক