মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পরও নানাভাবে, নানারূপে আবিষ্কৃত হয়ে চলেছেন জীবনানন্দ দাশ। ১২৮টি ছোটগল্প, ১৯টি উপন্যাস, অর্ধশতাধিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ আজ আমাদের সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। অথচ জীবদ্দশায় কবিতার বাইরে বাকি সব রচনা তিনি আড়ালেই রেখেছিলেন। এমনকি বহুল পঠিত কাব্যগ্রন্থ রূপসী বাংলাকেও ফেলে রেখেছিলেন বাতিলের খাতায়। ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’ নামে এই পাণ্ডুলিপি জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর কুড়ি বছর আগেই লিখেছিলেন। রূপসী বাংলা নামে প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে। এই কাটাছেঁড়া, প্রকৃত তথ্যগুলোর সামনে আসা, তার কবিতাকে নানাভাবে দেখার প্রয়াস—এসব সম্ভব হয়েছে অচিরেই কবি জীবনানন্দ দাশ তার নিজস্ব স্বর ও শক্তিসহ চিহ্নিত হয়েছিলেন বলেই। যুগের হাওয়ায়, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কথামালার ভেতরে ঘুরপাক খাননি বলেই ধাপে ধাপে তিনি প্রকাশিত ও পর্যালোচিত হয়েছেন। তার একটি লেখাকেও অস্বীকার কিংবা নস্যাৎ করে দেওয়ার সুযোগ নেই, সমালোচক-গবেষকদের এমন উপলব্ধিতে উন্নীত হওয়ার মধ্য দিয়েই কালের অগ্রণী কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশ আজ স্বীকৃত।
‘তাকে এড়িয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য’। যখন রবীন্দ্রবলয়ের টানে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছিল বাংলা কবিতা, যখন সব নিয়ম ভেঙে বেরুতে চাইছে, মুক্তির সন্ধান চাইছে, তখনই—‘আমি সব দেবতারে ছেড়ে/ আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি’ আর এই যে চলে আসা, সেই আসায় তিনি নিজেকেই বলেন, ‘বলি আমি এই হৃদয়েরে’। কী বলেন? ‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’—এই যে নিজেকে আলাদা করে তোলা, স্বতন্ত্র করে তোলা, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া, সেই ঝোঁকটাই পরিবর্তনের পক্ষে বহুদূর তাকে এগিয়ে নিয়েছে। এই অগ্রগামিতার তাৎপর্য বোঝার পক্ষে একটি জরুরি সিঁড়ি ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত গ্রন্থ নানা চোখে জীবনানন্দ।
বইয়ে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বিভিন্ন জনের মোট একুশটি লেখা সংকলিত হয়েছে। শুরুতেই রয়েছে সম্পাদক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর দীর্ঘ ভূমিকা, যা স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধের মর্যাদার দাবিদার; লেখা হয়েছে বইয়ে স্থানপ্রাপ্ত একুশটি লেখার প্রাসঙ্গিকতা পর্যালোচনা করে এবং মুক্ত চিন্তা ও যুক্তি-পরস্পরার মধ্য দিয়ে জীবননান্দ দাশকে বিশ্লেষণ করে। ১৯২৩ সালে ঝরাপালক কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে জীবনানন্দ দাশ যখন বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করছেন, ‘তখন প্রাক-আধুনিকতা যেমন কালের স্রোতে অবসিত হয়নি, তেমনি অব্যাহত রয়েছেন অবিশ্রান্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’, আবার আধুনিকতার স্রোতে পদ্য ও কবিতার জটও যখন রীতিমতো ক্রিয়াশীল, তখন জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আমাদের ভাবনাচিন্তা, সমস্যা-সংকটের জট ছাড়াতে সহায়ক হয়ে ওঠে বইয়ের এই দীর্ঘ ভূমিকাটি।
বইয়ে সূচিবদ্ধ লেখকরা হলেন—আবুল ফজল, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, জো উইন্টার, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আহমদ রফিক, আহমদ ছফা, হায়াৎ সাইফ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ক্লিনটন বি সিলি (অনুবাদ : ভাস্বতী চক্রবর্তী), আবু তাহের মজুমদার, সুতপা ভট্টাচার্য, ক্ষেত্র গুপ্ত, শাহরিয়ার মোল্লা, সালাহউদ্দীন আইয়ুব, আকতার কামাল, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, হুমায়ুন কবির, ভূমেন্দ্র গুহ, গোপাল রায় এবং প্রভাত কুমার দাস।
প্রবন্ধগুলোয় কবি জীবনানন্দ দাশের নানা দিক উঠে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে তার কবিকৃতির কথাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বইটি শুধু জীবনানন্দ দাশের কবিতা বোঝার জন্যই নয় : কোথাও শুধু একটি কবিতা, কোথাও কোনো বই, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, জীবনানন্দের ভাবনার জগৎ, তার সময় ও কাল, তাকে ঘিরে সাহিত্যিক গোষ্ঠীর ভাবনা যেমন উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি ব্যক্তি জীবনানন্দ দাশকেও খুঁজে পাওয়া যায়।
ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি মানুষের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের সংযোগ বা সখ্য কোনোটিই ছিল না। খুব বেশি অন্তরঙ্গ স্মৃতিও এ যাবৎ কারও লেখায় উঠে আসেনি; এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সংযোগ গোপাল রায়ের ‘জীবনানন্দের সঙ্গে পরিচয়’ শিরোনামের লেখাটি। নানা চোখে জীবনানন্দ ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর এক সানন্দ পরিকল্পনার ফসল। জীবনানন্দ চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।