কুড়িগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের ঘটনায় মানুষের পাশাপাশি বাড়ছে গবাদিপশুর মৃত্যুর ঘটনাও। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও খোলা মাঠে বজ্রঝড়ের সময় গরু, মহিষ ও ছাগল মারা যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন খামারি ও কৃষকরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রাণিসম্পদ খাত।
পরিবেশবিদরা বলছেন, আগাম সতর্কতা, সচেতনতা ও কিছু সহজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুকেও বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ জুন জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় বজ্রপাতে পৃথক স্থানে দুটি গরুর মৃত্যু হয়। উপজেলার কেদার ইউনিয়নের পশ্চিম বিষ্ণুপুর গ্রামের আনছার আলীর একটি গরু এবং কালীগঞ্জ ইউনিয়নের কমেদপুর বেগুনীপাড়া গ্রামের সন্তোষ কাপালীর একটি গাভী বজ্রপাতে মারা যায়। এছাড়াও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের আলোর চরে বজ্রপাতে মারা গেছে আরও একটি গরু।
অন্যদিকে রৌমারী উপজেলার খেতাইমারী গ্রামে বজ্রপাতে একটি মহিষ ও উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে একটিসহ গত দেড় মাসে জেলায় ১৩টি গরু ও মহিষ বজ্রপাতের শিকার হয়ে মারা গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক লাখ টাকা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামে বর্তমানে গরুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার, মহিষ ১১ হাজার, ছাগল ৭ লাখ ৪৫ হাজার, ভেড়া ১ লাখ ৪৯ হাজার এবং ঘোড়া রয়েছে ৩ হাজার ২১৬টি। এর মধ্যে চরাঞ্চলেই গবাদিপশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বজ্রপাতে প্রাণী মৃত্যুর ঘটনাও বেশি ঘটছে এসব এলাকায়।
নাগেশ্বরীর কালীগঞ্জ ইউনিয়নের কুমেদপুর বেগুনীপাড়া গ্রামের সন্তোষ কাপালী বলেন, কয়দিন আগে বজ্রপাতে আমার একটি গাভী মারা গেছে। গাভীটির পেটে বাচ্চাও ছিল। এতে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। গাভীটির দাম প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা।
উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সামছুল আলম বলেন, হঠাৎ বজ্রপাতে আমার একটি গরু মারা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করেছিলাম। ভালো দামে বিক্রি করার আশা ছিল, কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, প্রতিবছর বজ্রপাতে শুধু মানুষ নয়, বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণী মারা যায়। অথচ সামান্য সচেতনতা ও আগাম প্রস্তুতি থাকলে এ ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে কিংবা মেঘের গর্জন শোনা মাত্রই দ্রুত গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। খোলা মাঠ, উঁচু স্থান কিংবা বড় গাছের নিচে পশু বেঁধে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত হানে।
পরিবেশবিদদের মতে, গবাদিপশু রক্ষায় গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি। ইউনিয়ন পরিষদ, হাটবাজার, সমবায় সমিতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পোস্টার, লিফলেট ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা যেতে পারে। পাশাপাশি রেডিও, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ছোট ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রচার করলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, বজ্রপাতের সময় গবাদিপশুকে ধাতব শিকলে না বেধে পাটের দড়ি বা প্লাস্টিকের রশি ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ। এছাড়া গোয়ালঘর বা খামারের ওপর বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হলে পুরো খামারকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোতে খামারের নিরাপত্তায় বজ্রনিরোধক রড ও সঠিক আর্থিং ব্যবস্থার ব্যবহার অনেক আগে থেকেই চালু রয়েছে। কম খরচে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশেও ব্যবহার করা সম্ভব। মাঠের ধাতব বেড়া নিয়মিত আর্থিং করা এবং গোয়ালঘরের মেঝে শুকনো রাখার বিষয়েও খামারিদের গুরুত্ব দিতে হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও কৃষকদের সহায়তায় সরকার অনুদানের উদ্যোগ নিচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানালে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তরা সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।