বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক ‘পুশইন’-এর ধারাবাহিক চেষ্টা এবং সীমান্ত হত্যার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে আজ সোমবার (৮ জুন) নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন। বর্তমান সরকারের আমলে এটিই প্রথম সীমান্ত সম্মেলন, যা দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ বহু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) বিএসএফের দফায় দফায় চেষ্টা এবং আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ঢাকায় বসছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ সম্মেলন। এবারের সম্মেলনে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে নয়াদিল্লিকে কড়া বার্তা দিতে চায় ঢাকা।
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মাত্র চার দিনে ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর (বঙ্গাবাড়ী), নওগাঁর সাপাহার (হাপানিয়া), লালমনিরহাটের বারখাতা ও পাটগ্রাম এবং পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে সরাসরি বিএসএফের সহায়তায় অন্তত ২৩টি পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে দুই শতাধিক মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে বিজিবির দৃঢ় তৎপরতায় তা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার পর থেকে দেশের সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং বিজিবি সদস্যদের সশস্ত্র অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম জানান, এবারের সম্মেলনে বিজিবির মূল এজেন্ডাই থাকবে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন। কেউ বাংলাদেশি হলে তাকে গ্রহণে বাংলাদেশের আপত্তি নেই, তবে তার জন্য দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া রাতের অন্ধকারে সীমান্ত দিয়ে মানুষকে পুশইন করা আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত গত এক বছরে অন্তত ২ হাজার ৪৬৩ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক এবং রোহিঙ্গা মুসলিমও রয়েছে। কোনো ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব যাচাই বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন ছাড়া বিএসএফের এই পুশইনের চেষ্টা ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
এবারের সম্মেলনে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা ছাড়াও বিজিবির এজেন্ডায় থাকছে ভারতীয় ড্রোন ও হেলিকপ্টার কর্তৃক বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কড়া প্রতিবাদ। পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় বিএসএফ কর্তৃক ড্রোন ও হেলিকপ্টার উড়িয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করবে বিজিবি। পাশাপাশি, আগরতলার শিল্পবর্জ্য বাংলাদেশের আখাউড়ায় প্রবেশ ঠেকাতে ভারতীয় খরচে বর্জ্য শোধনগার (ইটিপি) স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হবে।
এর বাইরেও মাদক চোরাচালান বন্ধ, অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্ধারণ, আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ করা এবং ভারতীয় গণমাধ্যমে সীমান্তকেন্দ্রিক উসকানিমূলক ও মিথ্যা সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানাবে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।
চার দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। এতে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। অন্যদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদলে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন। আগামী ১১ জুন যৌথ আলোচনার দলিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সম্মেলনটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।