সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে অপতথ্য বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও সমাজের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কোনটি সত্য আর কোনটি বিভ্রান্তিকর, অনেক সময় সেটি বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক বিভাজন, ভুয়া তথ্য, সিউডো-মিডিয়া পেজ, ডিপফেক ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা মানুষের মতামত, নির্বাচন, সামাজিক সম্পর্ক এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতায় বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে দেশ রূপান্তর ও ডেটাফুল আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সম্পাদক, সাংবাদিক, গবেষক ও একাডেমিকরা অপতথ্যের বিস্তার, সংবাদমাধ্যমের সংকট, প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা, ফ্যাক্টচেকিং, মিডিয়া লিটারেসি এবং করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
দেশ রূপান্তর কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত সেই আলোচনার সম্পাদিত অংশ প্রকাশ করা হলো।
অপতথ্য ছড়ানোর লক্ষ্য সাধারণত দুটি : সমাজকে উত্তেজিত করা এবং রাজনৈতিক লাভ অর্জন করা। এর ফলে রাজনৈতিক চিন্তা বিভ্রান্ত হচ্ছে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এটি এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, মূলধারার সংবাদমাধ্যমও কখনো কখনো এর শিকার হচ্ছে। আমি নিজেও শিকার হয়েছি। আমার নামে এমন ফটো কার্ড আমাকে পড়তে হয়েছে যা আমি বলিনি। কখনো কখনো একটা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার লোগো এমনভাবে করা হচ্ছে বুঝাই যাচ্ছে না যে এটা ফেইক না।
এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; বৈশ্বিক বাস্তবতা। সোশ্যাল মিডিয়া এখন এমন এক অনিয়ন্ত্রিত মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রিন্ট ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে তাই বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। বাংলাদেশে অপতথ্যের একটি বড় কারণ হলো সমাজের গভীর বিভাজন। এই বিভাজনের কারণে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য সব ধরনের টুল ব্যবহার করছে। এটাকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বড় রাজনৈতিক সমস্যা।
সমাধানের জন্য তিনটি বিষয় জরুরি বলে মনে করি : সরকারি পর্যায়ে কিছু নীতিমালা, প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদমাধ্যমের সেলফ-গভর্নেন্স এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর জবাবদিহি। টেক প্ল্যাটফর্মের স্থানীয় নিবন্ধন, ব্যবহারকারীর দায়বদ্ধতা, ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা এসব নিয়ে ভাবতে হবে।
সমস্যা হলো, এই সংকট প্রথাগত সংবাদমাধ্যম তৈরি করেনি। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এমন প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের মত, প্রভাব বা রাজনৈতিক অবস্থান প্রচার করছে। অনেক সময় সংবাদমাধ্যমের নাম ও কাঠামো ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে সিউডো-মিডিয়া পেজগুলো সংবাদমাধ্যমের আদল ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে ফ্যাক্টচেকিং ইউনিট থাকা দরকার এ কথা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। ফলে মূল সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের বাইরে বড় বিনিয়োগ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।
তবু সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। সাংবাদিকরাও কখনো কখনো অপতথ্যের দ্বারা প্রভাবিত হন। কোভিডের সময় কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যের ওপর নির্ভর করে মূলধারার সংবাদমাধ্যমও ভুল করেছে। আগে প্রকাশের প্রতিযোগিতায় ভুল করার চেয়ে পরে সঠিকভাবে প্রকাশ করা ভালো।
সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে আমি সতর্ক। সরকারকে যখন এই ধরনের বিষয়ে সরাসরি জড়ানো হয়, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঝুঁকি বাড়ে। যদি কোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামো হয়, সেটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
সংবাদমাধ্যম অপতথ্যের শিকার, আবার কখনো কখনো অসতর্কতায় এর বাহকও হয়ে যায়। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করা সংবাদমাধ্যমের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু এখন অপতথ্যের প্রবাহ এত দ্রুত যে মূলধারার সংবাদমাধ্যমও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।
আমি মনে করি, অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই প্রত্যেকের। ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং সামাজিকভাবে। সরকারকে অবশ্যই বলব, তারা যেন ফ্যাক্টচেকিং উদ্যোগকে সহায়তা করে। কিন্তু সরকার নিজে কোনটি অপতথ্য আর কোনটি নয়, এটি নির্ধারণ করুক, তা আমি সমর্থন করি না। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাও অনেক সময় অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত থাকে।
মানুষকে অপতথ্যের বিরুদ্ধে জাগাতে হবে। মানুষের জাগরণ ছাড়া এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে এই বিশ্বাস রাখতে হবে, কিন্তু তার জন্য কাজও করতে হবে।
আমরা অপতথ্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে দায়ী করি, সেটি ঠিক। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভেতর থেকেও সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক সংবাদ যাচাই ছাড়া প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে পাঠকের আস্থা কমছে। বৈশ্বিকভাবে সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়াও একটি বড় সংকেত।
ডিজইনফরমেশনকে শুধু রাজনৈতিক বা প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি গণতন্ত্র, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক জীবনের জন্য হুমকি। এর মোকাবিলায় বহুস্তরীয় কৌশল দরকার।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মিডিয়া লিটারেসি নেই বললেই চলে। স্কুল-কলেজের বইয়ে গণমাধ্যমের প্রভাব, তথ্যের ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝুঁকি এসব নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা নেই। শুধু
আইসিটি শেখালেই হবে না; মানুষকে জানতে হবে একটি পোস্টের প্রভাব কী হতে পারে, ভুয়া তথ্য কীভাবে মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এআই গভর্নেন্সও এখন জরুরি। এআই দিয়ে ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও তৈরি হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজস্ব এআই নীতিমালা থাকা দরকার। একই সঙ্গে আইনি সংস্কার, মালিকানা কাঠামো, স্বাধীন পেশাগত মানদন্ড, অর্থনৈতিক মডেল এবং মিডিয়া লিটারেসি সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কৌশল নিতে হবে।
ফ্যাক্টচেকিং অবশ্যই দরকার, কিন্তু ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতাও জরুরি। কারা অর্থায়ন করছে, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী, তারা কোন মানদ-ে কাজ করছে এসব জানা দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো সংবাদ তাদের পছন্দ না হলে সেটিকে নানা উপায়ে অপতথ্য হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়। তখন অপতথ্যের ধারণাটিই আপেক্ষিক হয়ে যায়।
ফ্যাক্টচেক আর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এক জিনিস নয়। কোনো মানববন্ধন হয়েছে কি না এটি যাচাই করা ফ্যাক্টচেক। কিন্তু সেই মানববন্ধনে কে দাঁড়িয়েছিলেন, তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কী এসব তুলে ধরে মূল ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ফ্যাক্টচেক নয়।
আমি ডিজইনফরমেশনকে ভাইরাসের মতো দেখি। আগে ভাইরাস ছড়ানো হয়, পরে ভ্যাকসিন তৈরি হয়। একইভাবে ডিজইনফরমেশন ছড়ানো হচ্ছে, তারপর সেটি ঠেকানোর জন্য বাজার তৈরি হচ্ছে। এই রাজনৈতিক অর্থনীতি বুঝতে হবে। শুধু সাধারণ মানুষের মিডিয়া লিটারেসি নয়, মিডিয়ার ভেতরেও লিটারেসি দরকার। সাংবাদিকদের জানতে হবে অপতথ্য কারা তৈরি করছে, কেন তৈরি করছে, এবং আমরা অজান্তে তার অংশ হচ্ছি কি না।
বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা সাধারণত রাজস্ব ও বাজারের ভিত্তিতে দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের আইন ও বাজারশক্তি ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পেরেছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও আঞ্চলিক সহযোগিতা দরকার।
ফ্যাক্টচেকিং দরকার, কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। অপতথ্য ছড়ানোর পর ফ্যাক্টচেক করলে অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। তাই এখন প্রিবাঙ্কিং নিয়ে বেশি ভাবতে হবে মানুষকে আগে থেকেই শেখাতে হবে কীভাবে অপতথ্য চিনবে। মিডিয়া ও ইনফরমেশন লিটারেসি ছাড়া এর সমাধান নেই।
প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা যদি বলি, ঘটনাটি আসলে এমন ছিল না তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই প্ল্যাটফর্মকে আগে থেকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
তবে প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ করারও নিয়ম আছে। অনেক সময় আমরা সঠিকভাবে রিপোর্ট করতে জানি না। সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের জানা দরকার, কোন ধরনের কনটেন্ট কীভাবে রিপোর্ট করতে হয়।
সরকারের ভূমিকা দরকার, কিন্তু আইন তৈরির প্রবণতা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অপতথ্য মোকাবিলার নামে এমন আইন করা যাবে না, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করে। আইন প্রণয়নের আগে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ জরুরি।
এই আলোচনায় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের আরও বেশি যুক্ত করা দরকার। আমরা যারা সমাজবিজ্ঞান, সাংবাদিকতা বা নীতিনির্ধারণের ভাষায় কথা বলি, তারা সবসময় অ্যালগরিদম, এআই, ডিপফেক বা ব্যাকএন্ড প্রযুক্তির বিষয়গুলো বুঝি না। তরুণ প্রযুক্তিবিদদের যুক্ত করা জরুরি।
এটি শুধু সাংবাদিকদের কাজ নয়। আইনজীবী, পুলিশ, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ, স্থানীয় সাংবাদিক সবাইকে যুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় সাংবাদিকদের এই আলোচনায় আনতে হবে। কারণ অপতথ্যের প্রভাব অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়েই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই দুটিই একই সংগ্রামের অংশ। ডেটাফুলের পক্ষ থেকে আমরা এই আলোচনাকে একটি সূচনা হিসেবে দেখতে চাই। সংবাদমাধ্যম, একাডেমিয়া, মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট সংগঠন, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে। নিয়মিত আলোচনা, গবেষণা, নীতিপত্র, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ অবস্থান এসবের মাধ্যমে আমরা অপতথ্যের বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারি।