সন্তানের অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কাটাবেন যেভাবে

বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণ প্রজন্মের জীবনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। অনেক কিশোর-কিশোরী এটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করলেও, একটি বড় অংশ মারাত্মক আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি এখন আর সাধারণ কোনো অভ্যাস নয়, এটি একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা যা তরুণদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে যখন এই নিয়ে তোলপাড় চলছে, তখন আপনার ঘরের সন্তানটিও কিন্তু এই একই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে। তাই সে আসক্তির দিকে যাচ্ছে কি না তা বুঝতে বাবা-মায়ের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সাধারণত সন্তানের আচরণে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখলে বুঝতে হবে সে সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তিতে ভুগছে—

১। পড়ালেখা, খেলাধুলা বা বাস্তব জীবনের দায়িত্বে অবহেলা করা।

২। জোর করেও সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করতে না পারা।

৩। ইন্টারনেট বা ফোন হাতের কাছে না থাকলে প্রচণ্ড রাগ, চিৎকার বা মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশ করা।

৪। গোপনে বা মাঝরাতে লুকিয়ে ফোন ব্যবহার করা।

৫। ঘুম, খাওয়া-দাওয়া ও শারীরিক ব্যায়ামের রুটিন পুরোপুরি নষ্ট হওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষ দিনে গড়ে ৩৪৪ বার ফোন চেক করে। কিশোর-কিশোরীরা ফোন পাশে নিয়ে ঘুমানোর কারণে তাদের গভীর ঘুম হয় না। এই অনিদ্রা ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে যেসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে :

মানসিক রোগ ও বিষণ্ণতা : সোশ্যাল মিডিয়ায় নিখুঁতভাবে সম্পাদিত ও অবাস্তব ছবি দেখে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের জীবনের সাথে তুলনা করে। এর ফলে তাদের মধ্যে হীনমন্যতা, তীব্র বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও একাকীত্ব তৈরি হয়।

শারীরিক ও খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা : এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পর ৪০ শতাংশ মেয়ে ও ১৪ শতাংশ ছেলে নিজেদের শরীর নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। এর ফলে না খেয়ে ওজন কমানোর মতো বিপজ্জনক খাদ্যাভ্যাস (যেমন অ্যানোরেক্সিয়া) বাড়ছে।

পড়াশোনা ও সম্পর্কে ফাটল : দিনরাত নোটিফিকেশন চেক করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে এবং রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। পাশাপাশি তারা বাস্তব জীবনের বন্ধু ও পরিবারের চেয়ে ভার্চুয়াল গুরুত্ব দিচ্ছে।

আত্মঘাতী আচরণ : গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো আত্মহত্যা। প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ও সাইবারবুলিং-এর শিকার হয়ে অনেক তরুণ-তরুণী আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছে।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স-এর পরামর্শ মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য একজন কিশোর বা তরুণীর দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে স্ক্রিন টাইম (ডিভাইস ব্যবহার) সীমিত রাখা উচিত।

বাবা-মায়ের করণীয়
সন্তানকে এই আসক্তি থেকে বের করে আনতে কেবল বকাঝকা বা ফোন কেড়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে :

১। স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ : সন্তানের ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন এবং তাকে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো জরুরি।

২। উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং বন্ধ করা : সন্তান যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু স্ক্রল না করে, বরং প্রয়োজনে বা নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যে ইতিবাচকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

৩। নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা : পড়াশোনা বা ঘুমের সময় ফোনের সব নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার অভ্যাস করান।

৪। চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং : আসক্তি খুব বেশি হলে বাইরের সাহায্য নিতে হবে। অনেক সময় মানসিক চিকিৎসকের (কাউন্সেলর) পরামর্শ বা থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি কম্পানিগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর দিকগুলো জেনেও মুনাফার স্বার্থে কিশোর-কিশোরীদের টার্গেট করে যাচ্ছে। তাই সন্তানদের নিরাপদ রাখতে এই মুহূর্তে পারিবারিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র : সোশ্যাল মিডিয়া ভিকটিমস ল সেন্টার