রাজধানীর মোহাম্মদপুর শেরশাহ শূরী রোড এলাকায় পৈতৃক সূত্রে ৬ শতাংশ জমি পান তিন ভাই। তবে টাকার অভাবে কোনো স্থাপনা তুলতে পারেননি। দীর্ঘদিন পড়ে ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। সিএনজি গ্যারেজ বানিয়ে সাময়িক ভাড়া দেওয়ার চিন্তা করেন তারা। চার মাস আগে টিনশেড ঘর তুলতে গেলে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে স্থানীয় ‘আকবর গ্রুপে’র সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত ২ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ঘর তুলতে পেরেছেন।
তিন ভাইয়ের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাঁদার টাকা দিতে একটু দেরি হয়েছিল। সে কারণে শ্রমিকদের মারধর করেছে সন্ত্রাসীরা। আকবর গ্রুপকে চাঁদা না দিয়ে ওই এলাকায় কোনো ভবন নির্মাণ করা যায় না।
আকবর গ্রুপের প্রধান আসিফ আকবর পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী। তার বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। মিজানুর রহমান, মনির হোসেন, আমিন হোসেনসহ গ্রুপের অন্তত ২০ জন সদস্য ৪০ ফিট বছিলা রোড, চাঁদ উদ্যান ও বেড়িবাঁধ এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ সব ধরনের অপরাধ কর্মকা-ে লিপ্ত। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এই আসিফ আকবর ও তার বাহিনীকে শেল্টার-দাতা হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের মোহাম্মদপুর থানা কমিটির সাবেক সভাপতি আলী কাওছার মিন্টুর নাম উঠে এসেছে। আকবরের সঙ্গে তার ছবিও রয়েছে।
আলী কাওছার মিন্টু সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসিফ আকবর আমার রাজনীতি করে। এক সঙ্গে জেলও খেটেছি। আমি যখন থানা কমিটিতে ছিলাম, তখন আমার প্রোগ্রামে যেত।’
আকবর গ্যাং গ্রুপের প্রধান, আপনি তাকে প্রশ্রয় দেন এ রকম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওর দুইটা ট্রাক আছে, রাতে ইট সাপ্লাই দেয়। ভেতরে ভেতরে সে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে সেটা তার বিষয়। আমি এখন মহানগরের পদ পাওয়ার চেষ্টায় আছি। এ কারণে কেউ আমার নাম বলতে পারে।’
মিন্টুর সঙ্গে কথা বলার ঘণ্টাখানেক পর আকবর পরিচয়ে এক ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে কল করেন। মিন্টুকে তার বিষয়ে কি বলা হয়েছে তা জানতে চান এবং তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। শুধু মিন্টু একা নন; তার দুই ছেলেও মোহাম্মদপুর এলাকাজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত। বড় ছেলে নয়ন মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের সোর্স। ওখানকার ছিনতাইকারীচক্র তার নেতৃত্বে চলে। কোনো ছিনতাইকারী ছিনতাইকৃত অর্থের ভাগ না দিলে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেন নয়ন। নয়ন নিজেও একটি গ্যাং গ্রুপের নেতা। তার ছোট ভাই শাওনও অপরাধ জগতে প্রথম সারির একজন। বেশ কয়েক মাস আগে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত বছরের ১৬ জুন সোনা মিয়ার টেক্কি এলাকায় ফরমা আল আমিন ওরফে পাতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যায় শাওনের নামও উঠে আসে। তবে বড় ভাই সোর্স হওয়ায় শাওনকে গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্যাং সদস্য ও তাদের প্রশ্রয়দাতা প্রত্যেকের তালিকা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে। যাদের ছত্রছায়ায় অপরাধকর্ম সংঘটিত হয়, তাদের পরিচয় দেখা হবে না। তাদের আইনের আওতায় আসতেই হবে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়েছে, আকবর গ্রুপের মতো ঢাকায় ১৪৩টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। এলাকাভেদে গড়ে ওঠা এ সব গ্যাং গ্রুপের নেতা ও সদস্যদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বড় ভাই এমনকি সন্ত্রাসীরা শেল্টার দিচ্ছেন। রাজনৈতিক সংযোগে গ্যাং সদস্যরা নির্ভয়ে অপরাধ করে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্যাং সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও প্রশ্রয়দাতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের ধারে কাছেও যায় না পুলিশ। মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলে উল্টো শাস্তি ভোগ করতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে।
ঢাকার সব এলাকার গ্যাং গ্রুপ কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার শেল্টারে চলে। এর মধ্যে শুধু শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর এবং আদাবর থানাধীন ২০টি গ্রুপের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে বিএনপির স্থানীয় ৭ জন নেতা, কোনো কোনো নেতার সন্তান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩ নেতা এবং ৪ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম উঠে এসেছে। তারা অবশ্য গ্যাং গ্রুপগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
গ্যাং গ্রুপের প্রশ্রয়দাতারা গ্রেপ্তার না হওয়ার কারণ কি, এমনটি জানতে চাওয়া হয় র্যাব-২ এর অধিনায়ক মো. খালিদুল হক হাওলাদারের কাছে। উত্তরে তিনি বলেন, আমরা গ্যাং সদস্য ও প্রশ্রয়দাতা উভয়কেই আইনের আওতায় আনছি। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখছি। সে যত বড় (ক্ষমতাধর) ব্যক্তিই হোক। এমন অনেকেই আছেন, যাদের একেকজন তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানার কয়েকজন এসআই দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাঝেমধ্যে গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করেই টেকা যায় না। আর প্রশ্রয়দাতাদের গ্রেপ্তার করলে তো... অমুক নেতা, তমুক ভাই কল করেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো নেতার কর্মীকে গ্রেপ্তার করলেও দলবল নিয়ে মানববন্ধন, থানা ঘেরাও করার হুমকি দেন। বদলির হুমকি দেন। এর আগেও মোহাম্মদপুর থানা ঘেরাও করা হয়েছে। সে সময় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা পেছন থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৭ গ্রুপের প্রশ্রয় দেন বিএনপির ৭ নেতা : কয়েক মাস আগে মোহাম্মদপুর জাফরাবাদ এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনসহ তার পরিবারের সাত সদস্যকে কুপিয়ে আহত করে পাটালি গ্রুপের সদস্যরা। পরে গ্রুপের সদস্য ফরহাদ, হাসান ওরফে পাটালি হাসান, আলমগীর ওরফে ফর্মা আলমগীর ও রফিক গ্রেপ্তার হয়। এরা রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও বেড়িবাঁধ এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। গ্রুপটির নেতা সুজন মিয়া ওরফে ফর্মা সজীবকে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন মোহাম্মদপুর থানাধীন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম অপু ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ওসমান রেজা।
জানতে চাইলে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম অপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সজীব আমাকে মামা, মামা ডাকে। আমার সঙ্গে প্রোগ্রাম করে।’ কিন্তু সজীব তো কিশোর গ্যাং নেতা, এমনটি বলতেই কথা ঘুরিয়ে বলেন ‘ওহ, ওই সজীবের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি ভেবেছি, এমডি সজীবের কথা বলেছেন। গ্যাং লিডার সজীবের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনো দেখিনি।’ নিজ থেকেই অপু বলেন, ‘পাটালি গ্রুপ তো দুই ভাগে বিভক্ত। একটা সালাম চালায়। সালামকে আবার নেতৃত্ব দেয় যুবদলের (এক নেতার নাম)...।’ ফরহাদ গ্রুপের নেতা ফরহাদকে প্রশ্রয়দাতা হিসেবেও এই নেতার নাম উঠে এসেছে। গ্যাং গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জহিরুল ইসলাম অপুর নাম একটি গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায়ও রয়েছে।
আর ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান রেজা বলেন, তিনি এই নামে (সুজন মিয়া) কাউকে চিনেনই না।
ফরহাদ গ্রুপকে এবং নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, বেড়িবাঁধ এলাকায় সক্রিয় ‘টক্কর ল’ গ্রুপের নেতা শাহাদাত হোসেনকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মান্নান শাহীন। জানতে চাইলে মান্নান শাহীন বলেন, ‘আমি এদের চিনি না। আমি নিজেই ভুক্তভোগী। ওরা আমাকে ৩৬টি কোপ দিছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় লোকজনই এসব রটাচ্ছে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সূচনা কমিউনিটি সেন্টার, শিয়া মসজিদ ও কৃষি মার্কেট এলাকা দিয়ে চলাচলরত সাধারণ মানুষের টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল হারহামেশা ছিনতাই করে আসছে ‘চেতালেই ভেজাল’ গ্রুপটি। মাঝখানে এদের উৎপাত কমলেও সম্প্রতি আবার বেড়েছে। গ্রুপটির নেতা শান্ত ওরফে বুলেট শান্ত। আর তাকে শেল্টার দেন মোহাম্মদপুর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সিনিয়র সহ-সভাপতি লিটন মাহমুদ বাবু।
জানতে চাইলে লিটন মাহমুদ বাবু জানান, শান্ত ওরফে বুলেট শান্ত নামে কাউকে তিনি চিনেন না। কোনো চোর-বাটপাড়ের সঙ্গে তার সখ্য নেই। তার জানামতে, ওই এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকা- করে থাকে চাপাতি কাইয়ুম।
রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী রোড, আজিজ খান ও সাদেক খান রোড এলাকায় সক্রিয় ‘ডাইল্লা গ্রুপ’। এ গ্রুপের নেতা হৃদয় ওরফে ডাইল্লা হৃদয়কে শেল্টার দেন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা মো. শাকিল। চন্দ্রিমা হাউজিং, লোহার গেইট, নবোদয় ও বেড়িবাঁধ এলাকায় সব ধরনের অপরাধ কর্মকান্ডে লিপ্ত গাঙচিল গ্রুপ। গ্রুপটির নেতা মানিক ওরফে বোমা মানিককে শেল্টার দেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মোশারফ হোসেন ওরফে লম্বু মোশারফ। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তবে শাকিল ও লম্বু মোশারফকে কল করলেও তারা রিসিভ করেননি।
আওয়ামী লীগের তিন নেতার নেতৃত্বে ৪টি গ্রুপ : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পতন ঘটে। দলটির নেতাকর্মীরা এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। আত্মগোপনে থেকেই গ্যাং গ্রুপ চালাচ্ছেন তিনজন নেতা। অনুসন্ধানে ‘ভাইব্বা ল কিং গ্রুপ’র নেতা মোহন এবং ‘ঘুটা দে গ্রুপে’র নেতা আহম্মেদকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কবির। বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে কবিরের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রয়েছে। তার সব ব্যবসা দেখভাল করেন বিএনপির ওই সব নেতা।
রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকার ‘স্টার বন্ড’ গ্রুপটি এখন খুব বেশি সক্রিয় না থাকলেও মাদক সেবনসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে সিদ্ধহস্ত। গ্রুপটির নেতা শাকিলকে আত্মগোপনে থেকে শেল্টার দিচ্ছেন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. খোকন। ৬০ ফিট, বাংলাদেশ বেতার মোড়, বিএনপি বস্তি, শেরেবাংলা নগর কুমিল্লা বস্তি এলাকায় জাকির হোসেনের ‘জাকির গ্রুপ’ নামে অপরাধ কর্ম সংঘটিত হয়। আত্মগোপনে থেকে জাকিরকে শেল্টার দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান ওরফে আসাদ।
চার শীর্ষ সন্ত্রাসী চার গ্রুপের নেতৃত্বে : ‘লেভেল হাই’ নামে একটি গ্রুপ চাঁদ উদ্যান, ভাঙা মসজিদ ও বেড়িবাঁধে বর্তমানে সব থেকে বেশি সক্রিয়। এই গ্রুপের মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও মারামারির ঘটনায় এলাকাবাসী আতঙ্কে রয়েছেন। গ্রুপটির নেতা শরিফ ওরফে মোহনকে শেল্টার দিচ্ছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত কিলার বাদল। ‘আর্মি আলমগীর’ গ্রুপের প্রধান জহুরুল ইসলাম ওরফে কালা জহির। তাকে ও তার গ্রুপের সদস্যদের শেল্টার দিচ্ছেন মোহাম্মদপুর থানার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী। ‘ল ঠেলা’ গ্রুপের নেতা মাওরা ইমরান, এটিও গ্যারেজ সোহেল নামে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালনা করেন কিলার বাদল এবং আশরাফ। এলেক্স গ্রুপ নামে চলে দুটি গ্রুপ।
আগামীকাল : গ্রেপ্তারের পরই জামিন!