বাজার জমিয়েছে হিমসাগর, দামে চাষিরা অখুশি

রাজশাহীর পাড়া-মহল্লা থেকে হাটবাজার সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে আমের মিষ্টি গন্ধ। বাজারে তো বটেই, ভ্যানে করে পাড়ায়-পাড়ায় আম বিক্রি করছে ছোট ব্যবসায়ীরা। সবজি বাজারেও জায়গা হয়েছে কাঁচা-পাকা আমের। এ অঞ্চলের আমবাজার দখল করে আছে হিমসাগর আর গোপালভোগ। তবে, দাম নিয়ে হতাশ আম বাগান মালিকরা। ব্যাপক হারে আম পেকে যাওয়ার কারণে দাম পড়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। অবশ্য কৃষি বিভাগ বলছে সার্বিকভাবে এ অঞ্চলের আমের পরিস্থিতি ইতিবাচক। আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী অঞ্চলের আমের বাজার মন্দা যাচ্ছে। করোনা মহামারীর দুবছর আমের ব্যবসায় ধস নেমেছিল। এর পরে দুবছর আমের ভরা মৌসুমে রমজান মাস হওয়ায় চাহিদা কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের। তার পর ভরা মৌসুমে প্রচণ্ড খরায় একসঙ্গে আম পেকে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতায়ও বাজারে খারাপ প্রভাব পড়ে। এমনি করে কয়েক বছর ধরে ভালো লাভের আশা পূরণ হয়নি চাষিদের।

এবারের মৌসুমে গাছে ব্যাপক হারে মুকুল আসায় আশাবাদী হয়েছিলেন আম চাষিরা। কিন্তু যে হারে মুকুল ছিল সেভাবে আম হয়নি। খরায় গুটি ঝরে পড়ায় অনেক গাছেই শেষ পর্যন্ত আম টিকেনি। তারপরও যে পরিমাণ ফলন হয়েছে তার দাম পেলে তাদের মুখে হাসি ফুটবে বলে মনে করছেন।

অপরিপক্ব আম যাতে কেউ পাড়তে বা বাজারজাত করতে না পারে এজন্য ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার ঘোষণা করে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ১৫ জুন থেকে হাইব্রিড আম্রপালি ও ফজলি সংগ্রহ শুরু হবে। ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা পাড়া যাবে। তার আগে ১৫ মে গুটি জাতের আম, তারপর গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, রানীপছন্দ, লক্ষণভোগ পাড়া এবং হিমসাগর বা ক্ষীরসাপাত পেড়ে বাজারে তোলা শুরু হয়।

এ অঞ্চলের আমের বাজার জমে মূলত হিমসাগর দিয়ে। ঈদের ছুটির কারণে হিমসাগর আম বাজারে আনতে ২/৩টা দিন দেরি করেন চাষিরা। এখন হিমসাগরের ভরা মৌসুম। সেই সঙ্গে এখনো অনেক গাছেই আছে গোপালভোগ। সেই সঙ্গে কিছু গুটি আমও বাজারে রয়েছে।

ঈদের ছুটির পর বাজার জমতে শুরু করলেও প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা। আগের বছরে তুলনায় এখন পর্যন্ত দাম কম বলছেন তারা। বাজারে আমের জোগান অনুপাতে এখনো ক্রেতার সংখ্যা কম হওয়ায় দাম অনেকটাই কম বলে দাবি করছেন চাষিরা।

রাজশাহীর বৃহত্তম আমের হাট পুঠিয়ার বানেশ্বর হাট। এই হাটে পুঠিয়া, চারঘাট, বাঘা, পবা ও দুর্গাপুর উপজেলার বাগান থেকে আম বিক্রি করতে আসেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। ভোর থেকেই ভ্যান, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনে করে আম নিয়ে আসছেন চাষিরা। কিন্তু হাটে পৌঁছানোর পর অনেকের মুখেই হতাশার ছাপ দেখা যাচ্ছে। আড়তদাররা আমের মান যাচাই করে যে দর বলছেন, তা মেনে নিতে পারছেন না চাষিরা।

চাষিরা বলছেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে আমের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মৌসুমের শুরুতে যে গোপালভোগ আমের মণ বিক্রি হয়েছিল প্রায় দুই হাজার টাকায়, ঈদের পর সেটি নেমে এসেছে দেড় হাজারে। একইভাবে গুটি আমের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ১৫ মে বাজারে আসা গুটি আমের মণপ্রতি দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকার মধ্যে। সাধারণত প্রথমে যখন আম উঠে তখন যে দাম থাকে দিন যত যায় দাম বাড়ার কথা। কিন্তু গোপালভোগ ও গুটি জাতের আমের ক্ষেত্রে হয়েছে তার উল্টোটা। দাম না বেড়ে কমে গেছে।

বানেশ^র হাটে লক্ষণভোগের মণ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকায়। গত বছর একই সময়ে এই আমের দাম দেড় হাজার টাকার নিচে নামেনি বলে জানান ব্যবসায়ীরা। হিমসাগর আম বিক্রি হচ্ছে দেড় থেকে ২ হাজার টাকা দরে। 

এই হাটে আসা আমচাষি আমিনুল ইসলাম জানান, সারের দাম, কীটনাশক, সেচ খরচ ও শ্রমিকের মজুরি সবই বেড়েছে। কিন্তু বাজারে এসে আমের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এত খরচ করে আম উৎপাদন করছি, কিন্তু বাজারে এসে সেই খরচই তুলতে পারছি না।

বানেম্বর হাটে আসা চাষিরা বেশির ভাগই হতাশা জানিয়েছেন। তারা বলছেন বাগানে এমনিতেই আম কম। আবার যেটা নিয়ে আসছি সেটার দাম পাচ্ছি না। আমরা তো আবারও ক্ষতির মুখেই পড়ছি। 

চাষি ও ব্যবসায়ীদের ধারণা, কোরবানির ঈদের কারণেই মূলত বাজারে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই ঈদে মানুষজন প্রধান ব্যস্ততা থাকে পশু কেনাবেচা, কোরবানি ও মাংস সংরক্ষণ নিয়ে। ফলে ফলমূলের বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা কমে যায়। একই সময়ে কুরিয়ার ও পরিবহন সেবাও সীমিত থাকায় ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে আম পাঠানো ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে।

চারঘাটের চাষি সৈকত ইসলাম জানান, তার ২০ বিঘা জমিতে আম বাগান রয়েছে। এবার মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগে দাম ভালো পাননি। হিমসাগর কেবল উঠতে শুরু করেছে। দাম কিছুটা বেশি পেলে হতাশা থাকবে না।

শালবাগানের আম ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, মৌসুম তো কেবল শুরু হলো। মূলত হিমসাগরই বাজার জমিয়েছে। এখন এটা খুচরা পর্যায়ে ২ হাজার ২২০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। দিন যত যাবে দাম বাড়বে। তবে, গরমের কারণে একটু শঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টি হয়ে আবহাওয়া একটু ঠা-া না হলে এক সঙ্গে আম পেকে যেতে পারে। এ রকম হলে চাহিদার তুলনায় এক সঙ্গে বেশি আম বাজারে চলে আসবে। এতে দাম পড়ে যাবে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, ‘এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহও বেশি। ফলে দামের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে মৌসুম যত এগোবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, বাজার পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আশা করছি।’

আঞ্চলিক কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নাটোরে প্রায় ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ১২ লাখ টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত যে আম গাছে রয়েছে তাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত চাষিরা আমে লাভবান হবে বলেই আশা প্রকাশ করেন তিনি।