ভোরের কুয়াকাটা সৈকতে তখনো পর্যটকের ভিড় জমেনি। ধীরে ধীরে ভাঙছিল ঢেউ। সেই ঢেউয়ের ফাঁকেই বালুর ওপর পড়ে ছিল একটি ডলফিনের নিথর দেহ। শরীর ফুলে গেছে, চামড়া উঠে এসেছে, চারপাশে ভনভন করছে মাছি। কৌতূহলী মানুষ কাছে এলেও তীব্র দুর্গন্ধে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। কুয়াকাটার সৈকতে এমন দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। গত নয় বছরে অন্তত ১৪০টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে এই সৈকতে। শুধু চলতি বছরেই পাওয়া গেছে চারটি মৃত ডলফিন। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এত মৃত্যুর পরও একটি ডলফিনেরও পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্ত হয়নি। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো অজানা।
সৈকতে ভেসে আসা মৃত ডলফিনগুলো মাটিচাপা দেওয়ার কাজটি প্রায় নিয়মিত দায়িত্বে পরিণত হয়েছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন’ (উপরা)-এর সদস্যদের জন্য। সংগঠনটির সদস্য কে এম বাচ্চু ২০১৭ সাল থেকে নিজ উদ্যোগে এ কাজ শুরু করেন। পরে সদস্যদের নিয়ে বন বিভাগ ও কুয়াকাটা পৌরসভার সহযোগিতায় মৃত ডলফিনগুলো মাটিচাপা দেওয়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বাচ্চু আক্ষেপ করে বলেন, ‘৯ বছরে ১৪০টি ডলফিন মাটিচাপা দিয়েছি, কিন্তু একটিরও ময়নাতদন্ত হলো না। মৃত্যুর কারণ জানার কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি।’
পরিবেশকর্মীদের দাবি, অধিকাংশ মৃত ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। কোথাও গভীর ক্ষত, কোথাও কাটা দাগ। পরিবেশকর্মী আবুল হোসেন রাজু ও আরিফুর রহমানের ধারণা, জাহাজের প্রপেলারের আঘাত কিংবা মাছ ধরার জালে আটকে শ্বাসরোধ হয়ে অনেক ডলফিনের মৃত্যু হচ্ছে। স্থানীয় জেলে তৈয়ব মাঝি বলেন, ‘জাল তুলতে গিয়ে মাঝেমধ্যে ডলফিন পাই। জালে পেঁচিয়ে শ^াস নিতে না পেরে অনেক সময় মারা যায়।’ তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সব মৃত্যুর কারণ এত সরল নয়।
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম মৃত ডলফিনটি ভেসে আসে। এরপর এপ্রিলে মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে আরও তিনটি ডলফিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সবশেষ ২৫ মে ট্যুরিজম পার্কসংলগ্ন সৈকত থেকে প্রায় ১০ ফুট দীর্ঘ একটি মৃত ইরাবতী ডলফিন উদ্ধার করা হয়।
ওয়ার্ল্ডফিশের সহযোগী গবেষক বখতিয়ার উদ্দিনের মতে, উপকূলের কিছু এলাকায় এখনো বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা রয়েছে। সেই বিষাক্ত পানি ও খাদ্যচক্রের প্রভাব ডলফিনের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে। এদিকে গবেষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। সাম্প্রতিক গবেষণায় উপকূলীয় পানিতে ১৭৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। ক্ষুদ্র এসব প্লাস্টিক মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। আর সেই মাছ খাচ্ছে ডলফিন।
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর পর ফরেনসিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। আমাদের দেশে এখনো সেই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।’
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির দলনেতা রুমান ইমতিয়াজ তুষারের মতে, ‘ডলফিন শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি সমুদ্রের স্বাস্থ্যের সূচক। মানুষের জ্বর যেমন শরীরের অসুস্থতার সংকেত, তেমনি ডলফিনের মৃত্যু সমুদ্রের অসুস্থতার বার্তা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে মৃত ডলফিনের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।’
মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম মনিরুজ্জামান স্বীকার করেন, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ময়নাতদন্ত সম্ভব হচ্ছে না। তবে খবর পেলেই আমরা ঘটনাস্থলে যাই এবং মরদেহ মাটিচাপা দিই। কিন্তু এখানে কোনো ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যায় না।’ তিনি জানান, এ বিষয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সামুদ্রিক প্রাণীবিশেষজ্ঞ মো. কামরুল ইসলামের মতে, ডলফিন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতাভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি বন বিভাগের অধীনে। আবার এটি সামুদ্রিক প্রাণী হওয়ায় মৎস্য বিভাগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তার ভাষায়, ‘দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন না থাকায় মৃত ডলফিনের ময়নাতদন্ত হয়নি।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, জাহাজের ধাক্কা, প্লাস্টিক দূষণ, শব্দদূষণ, খাদ্যসংকটসহ নানা কারণে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে জরুরি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ দরকার।
নয় বছরে ১৪০টি ডলফিনের মৃত্যু উপকূলীয় পরিবেশ ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক বিশেষ উদ্বেগের বার্তা। কিন্তু মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে প্রতিবারই ডলফিনগুলো মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সমুদ্রের বুক থেকে ভেসে আসা এই নীরব সতর্কবার্তার উত্তর অজানাই থেকে যাচ্ছে।