স্টার্টআপে ৪০০ কোটি টাকার প্রণোদনা, ডলার বাজারে স্বস্তি

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৩৩ এএম

স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরছে এবং বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আস্থা পুনরুদ্ধারে পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনসহ একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তা এবং তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগের সুযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্টার্টআপ তহবিলের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী বাজেটে এ খাতে আরও বড় পরিসরে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।

সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে তরুণদের জন্য বিনা সুদের কোনো ঋণ প্রকল্প না থাকলেও সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালিত পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। আর জামানত সাপেক্ষে ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে আরও ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। শুধু ঋণ নয়, স্টার্টআপ খাতে ইক্যুইটি বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশীদারত্বে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো ইক্যুইটি সহায়তা পাবে।

ডলার পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ : সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ডলার সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা না গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের ফলে বৈদেশিক লেনদেনে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কার : কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তুলেছে। তিনি জানান, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’-এর আওতায় পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া, খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, একজন গ্রাহকের ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর), অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের জন্য প্রণোদনা নীতিমালা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিড়ির কর বাড়ছে না

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিড়ির মূল্য ও করহার অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। বিড়ির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), এক শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ এবং প্রচলিত কর কাঠামো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নিবন্ধিত মোবাইল সিম জনসংখ্যার ‘দ্বিগুণ’ : দেশে বর্তমানে বৈধভাবে নিবন্ধিত মোবাইল সিমের সংখ্যা ৩২ কোটি ৮২ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত জনশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। তবে এই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক।

ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা : ডাক বিভাগের সেবা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস বা পোস্ট পিকআপ পয়েন্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জানান, ডাক বিভাগের সেবা আরও গতিশীল করতে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতকে সহায়তা দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৪টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রসেসিং, বুকিং, সর্টিং, পরিবহন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ডাক বিভাগের সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনসাধারণের সুবিধার্থে সরকারি ডাক সেবার মানোন্নয়ন, সেবার গতি বৃদ্ধি এবং কার্যক্রম সম্প্রসারণের আওতায় সরকারি নাগরিক সেবা যেমন ভূমির ডকুমেন্টস হোম ডেলিভারি, পাসপোর্ট বাল্ক ডেলিভারি এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স হোম ডেলিভারি কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী ই-কমার্স পণ্যের ক্যাশ অন ডেলিভারি কাজ প্রক্রিয়াধীন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক কার্যক্রমের আওতায় ভিডিও মামলা ও ট্রাফিক নোটিসসংশ্লিষ্ট প্রাপকের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে। ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতকে সহায়তা দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৪টি ফুল ফিলমেন্ট সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ইস্যুকৃত দেশের বিভিন্ন ফল উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে সবচেয়ে কম মাশুলে নিরাপদে ও দ্রুততম সময়ে মৌসুমি ফল পরিবহন করা হচ্ছে। এ ছাড়াও, উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস বা পোস্ট পিকাপ পয়েন্ট স্থাপনের বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে, যা ডাক বিভাগের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত