বুকারজয়ী অনূদিত উপন্যাস

তাইওয়ান ট্রাভেলগ থেকে নির্বাচিত অংশ

‘মাফ করবেন, আপনি কি আওইয়ামা চিজুকো-সেনসেই?’ জাপানি ভাষায় কথা বলা এক পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

এক যুবক। যুবকটির পরনে গ্রীষ্মকালীন স্যুট। ঘন ভ্রু, সেই সঙ্গে নিবিড় চোখের পাপড়ি আর চওড়া কপাল বেয়ে ঘামের বড় বড় ফোঁটা ঝরছিল।

‘আমি মিশিমা, তাইচু সিটি হল থেকে বলছি।’

আমার মুখ থেকে একটি মৃদু শব্দ বের হলো—‘ওহ্’।

তাইচু স্টেশন। দুপুর ২:০০টা।

আমি এই যুবকের কথা একবারেই ভুলে গিয়েছিলাম।

মিশিমা জানালেন, আমার শারীরিক গড়ন সম্পর্কে তাকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। তিনি রেলস্টেশনে আমার মতো দেখতে কাউকে খুঁজে না পেয়ে টিকিট চেকারকে আমার মতো কাউকে দেখেছেন কিনা জিজ্ঞেস করেছিলেন। কানজো ব্রিজ অ্যাভিনিউতে পৌঁছানোর পর তিনি সহজেই তার লক্ষ্য চিহ্নিত করে ফেলেন : একশ পঁয়ষট্টি সেন্টিমিটার উচ্চতা নিয়ে মহা-দেবদারুখ্যাত আমি অধিকাংশ পুরুষের চেয়েই ছিলাম দীর্ঘাঙ্গী এক নারী। ‘গাড়িটি একদম মোড়ের মাথায় আছে’, আমার ব্যাগট্যাগ তুলে নিয়ে সামনের দিকে ইশারা করে মিশিমা বললেন, ‘এই যে এদিকে আসেন।’

‘আমি সত্যিই দুঃখিত।’

‘দয়া করে ক্ষমা চাইবেন না,’ রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে একেবারে গম্ভীর মুখে তিনি কথাগুলো বললেন। ট্যাক্সিক্যাবে বসার পর আমি আবারও আমার বাহুর ভাঁজে কাগজের পাতলা প্যাকেটটির অস্তিত্ব টের পেলাম। মনে পড়ল সেই তরুণীর কথা। কখন সে হারিয়ে গেল? আমি তো তাকে ঠিকমতো ধন্যবাদটুকুও দিতে পারিনি। আমার মনোযোগ আবার গাড়ির জানালা গলিয়ে দ্রুত পেরিয়ে যাওয়া নতুন এক পৃথিবীর দিকে চলে গেল : দেখছি চীনা, পশ্চিমী আর জাপানি ধাঁচের বাড়িঘর, মাঝে মাঝে ধানক্ষেত ও কলাবাগানের ইশারা, উজ্জ্বল লাল আর গাঢ় সবুজের মিশ্রণ। দক্ষিণের কোনো দেশের উষ্ণ বাতাস গাড়িতে ভেসে আসছিল, যা আমার মনে আবারও সেই বাজার, জনাকীর্ণ ভিড়, তরুণীটির গালের টোল আর রক্তিম মুখের স্মৃতি ফিরিয়ে আনল।

‘মিশিমা-সান, দ্বীপটি সত্যিই চিত্ররূপময় ও মনোরম! দারুণ প্রাণবন্ত!’

‘সত্যিই তাই।’

‘আর দ্বীপবাসীরা কতটা বন্ধুত্বপূর্ণ, কতটা দয়ালু!’

‘ঠিক কথা।’

‘একটু আগে বাজারে আমি অনেক আকর্ষণীয় জিনিস দেখেছি—আমি নিশ্চিত, আমার ভ্রমণের বাকি অংশটুকু অত্যন্ত আনন্দদায়ক হবে।’

‘নিশ্চয়ই।’

‘এমনকি তার পাঠ্যপুস্তকের নীরস উত্তরের একঘেয়েমিও আমার তখনকার ফুরফুরে মেজাজকে নষ্ট করতে পারল না। কী যে মায়াবী জায়গা!’

মিশিমা এবার যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া শুরু করলেন। প্রথমে আমরা শহরের বাইরে মুহোর তাকাদার বাড়িতে যাব, সেখানে নিশিনকাই নারী সংগঠনের প্রতিনিধি মাদাম তাকাদা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। যদিও আমার আমন্ত্রণপত্রটি সাধারণভাবে তাইচু সিটি হল থেকে পাঠানো হয়েছিল, বাস্তবে আমার প্রকৃত আমন্ত্রক ছিলেন নিশিনকাই।

‘আওয়ামা-সেনসেই, আপনি যখনই ভ্রমণে বের হবেন, আপনার গাইড হিসেবে স্থানীয় সরকারের একজন কর্মী নিয়োজিত থাকবেন। সেই কর্মীর দায়িত্ব হবে আপনার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং অন্যান্য যাবতীয় প্রয়োজন মেটানো।’ সামনের যাত্রী-আসন থেকে যতটা সম্ভব আমার দিকে ঘুরে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে মিশিমা কথাগুলো বললেন। তিনি আরও বললেন, ‘আপনি যতদিন তাইচুতে থাকবেন, ততদিন আপনার দোভাষী এবং গাইড হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হবে। তবে এরই মধ্যে এখানে আপনার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা মাদাম তাকাষদা করে রেখেছেন।’

‘এই কষ্টটা করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’ একটু থেমে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘মিশিমা-সান, যদি আপনি আমার গাইড হিসেবে কাজ করেন তাহলে আমি কি আপনাকে দ্বীপটি সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন করতে পারি?’

 ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’

‘তাহলে বলেন তো, আমি যে ফলটি কিনেছি সেটি আসলে কী ফল?’

‘আনারস।’

‘এই দ্বীপের মানুষ একে কী বলে?’

‘তাইওয়ানি উপভাষায় একে ওং-লাই বলা হয়।’ 

‘ভেষজ বিক্রেতার পাশে বসে মানুষ যে পানীয় খাচ্ছিল, সেই পানীয়কে কী বলে? ওটা কি চীনা কোনো ওষুধ? দ্বীপের মানুষ অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে কী বাজারে গিয়ে এসব খায়?’

‘না, না, ওটা ওষুধ নয়। ওটা এক ধরনের স্থানীয় পানীয়, যার নাম তশেন-তশাউ-আ চা।’

‘আমি লোকজনকে এক ধরনের অর্ধ-স্বচ্ছ ঘোলা হলদেটে ডেজার্ট খেতেও দেখেছি। সেটা কী?’

‘ওটাকে বলে ও-গিও অথবা হুন-কুয়ে।’

‘দুটো কি একই জিনিস?’

‘দেখতে একই রকম হলেও স্বাদে ভিন্ন।’

‘আর ওই ছোট, কালো, মুক্তার মতো দানাগুলো?’

‘ওগুলো হলো হুন-ইন।’

‘মিশিমা-সান, দ্বীপের সংস্কৃতি সম্পর্কে কত কিছু জানেন আপনি! আপনি কি তাইওয়ানে অনেক দিন ধরে কাজ করছেন?’

তিনি কয়েক মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়লেন। ‘আমি এই দ্বীপেই জন্মেছি।’

‘ওহ্, তাই নাকি! চমৎকার!’ আমি আরও চমকিত হলাম। ‘আমি এখানকার এসব খাবার খেয়ে দেখতে চাই। আপনি কি আমার জন্য সেই ব্যবস্থা করতে পারবেন?’

এবার যখন তিনি আমার দিকে ফিরলেন, তার ঘন ভ্রুজোড়া সামান্য কাঁপল। লোকটি সম্ভবত মনে মনে গজগজ করছিলেন, এই অবাধ্য নারী কীসব আবোলতাবোল বকছে? কিন্তু আমি পরোয়া করিনি—অন্যদের কাছ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া পেতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি মুখের ভাব স্বাভাবিক করে বললেন, ‘আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’

‘আজ রাতের মধ্যেই কি কিছু পাওয়া যাবে? ধরুন, ওই ভেষজ চা—তশেন-তশাউ-আ চা।’

‘আওয়ামা-সেনসেই, চিন্তা করবেন না। আপনাকে স্বাগত জানাতে আমরা দারুণ নৈশভোজের আয়োজন করেছি।’

মাদাম তাকাদা আমার জন্য একটি বড়, গোছানো পশ্চিমা ধাঁচের ঘরের ব্যবস্থা করেছিলেন। বিকেলে তিনি একটি চা চক্রের আয়োজন করলেন, যেখানে নিশিনকাইয়ের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। এরপর আমরা সবাই মিলে ব্যস্ত তাইচু শহরে ডিনারের জন্য রওনা হই। ডিনারটি সিটি হলের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স-সান ‘বাইশুনেন’ নামের একটি রেস্তোরাঁতে আয়োজন করেছিলেন। সেটি ছিল মূলত মূল ভূখণ্ডের অতিথিদের উপযোগী তাইওয়ানি খাবারের একটি রেস্তোরাঁ।

মিশিমা ঠিকই বলেছিলেন। সে রাতে আমার জন্য সত্যিই রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। সেটা ছিল আসলেই জাঁকজমকপূর্ণ ভোজ—নোনতা মাছের ডিম, ভাজা সসেজ, কষা শূকরের পা, হাঙরের পাখনার স্টু, কচ্ছপের নরম খোসা, সামুদ্রিক শামুকের স্যুপ, আঠালো চালের ওপর ভাপ দেওয়া কাঁকড়া, এরপর যত্ন করে কাটাকুটি করে বেছে নেওয়া শাকসবজি, মাংস ও সামুদ্রিক খাবারের চমৎকার স্টার-ফ্রাই। ডেজার্ট হিসেবে ছিল বাদামের তোফু এবং ‘আট পদের বিশেষ’ চালের খাবার। মিষ্টি আঠালো চাল, শুকনো ফল এবং লাল শিমের পেস্ট দিয়ে তৈরি এক ধরনের পুডিংও ছিল মেনুতে। সবশেষে ছিল কফি এবং তাইওয়ানের উলং চা।

সবকিছুই ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু এবং একই সঙ্গে পুরোপুরি জাপানিদের পছন্দের উপযোগী। আমার কোনো সন্দেহ ছিল না যে রেসিপিগুলো জাপানিদের রুচি অনুযায়ী বেছে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি কোনো কোনো খাবার তো নতুন করে উদ্ভাবন করা হয়েছিল। আমি এত খাবার খেয়েছিলাম যে আমার পাশে বসা স-সান হো হো করে হেসে ওঠে।

কিন্তু না—সেগুলো ঠিক তাইওয়ানি খাবার ছিল না, যা খাওয়ার জন্য আমি ব্যাকুল ছিলাম। মাদাম তাকাদার গাড়িতে ওঠার আগে আমি একটু অভিযোগের সুরে বললাম, ‘মিশিমা-সান, আমার সেই তশেন-তশাউ-আ চায়ের কী হলো?’

তিনি শান্তভাবে আমার দিকে তাকালেন।

‘মিশিমা-সান, দয়া করে তশেন-তশাউ-আ চা না হলেও চলবে, আমি এখানকার রাস্তার কোনো সাধারণ খাবার একটু চেখে দেখতে পারলেই খুশি হব।’

‘আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব,’ তাঁর ভ্রুজোড়া আবারও কুঞ্চিত হয়ে কাছাকাছি চলে এলো।

২.
পরদিন সকাল। সারারাত খুব ভালো ঘুম হওয়ায় বেশ ঝরঝরে লাগছিল এবং তাইওয়ানে আমার প্রথম বক্তৃতাটি দিলাম। এটি ছিল ছোটখাটো একটি অনুষ্ঠান। নিশিনকাইয়ের সদস্যদের জন্য তাকাদার বাড়ির প্রশস্ত লবিতে আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আগের দিনের চা-চক্রের পরিচিত মুখগুলো তো ছিলই, পাশাপাশি কিছু অল্প বয়সী নারীও ছিলেন যারা বয়স্কদের আত্মীয় বলে মনে হলো। আমি ‘তারুণ্য ও আমার ভাবনা’ বিষয়ে দুই ঘণ্টা কথা বললাম।

তার আগে আমি সকালের নাশতা সেরেছিলাম সাদা ভাত, আচারযুক্ত সবজি, সামুদ্রিক শৈবাল, একটি কাঁচা ডিম এবং ভাজা মাছের সঙ্গে তোফু ও মাছের মিসো স্যুপ দিয়ে—ঠিক যে ধরনের খাবার আমি জাপানে থাকতে খেতাম। এতে আমার মন কিছুটা দমে গেল এবং আমি পেট ভরে খেলাম না, ফলে দুপুরের খাবারের সময় ঘনিয়ে আসতেই আমার মাথায় মিষ্টির চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। চিনি ছিটানো ভাজা রুটি, ক্রিম কুকিজ, ইয়োকান জেলি, লাল শিমের বান—এসব সুস্বাদু খাবার লোভনীয় হলেও এর সবই আমি নাগাসাকিতেই খেতে পারতাম। তাইওয়ানের এই গরমে আমার পিঠ বেয়ে ঘামের স্রোত নামছে, তৃষ্ণা দূর করার জন্য আরও প্রয়োজন ছিল ডেজার্টের। ঠান্ডা ও-গিও, হুন-কুয়ে, হুন-ইন, তশেন-তশাউ-আ চা এবং রসে ভরা মৌসুমি ফল—এসবের স্বাদ পাওয়ার জন্য আমি ভীষণ ব্যাকুল হয়ে উঠলাম!

আমার বক্তৃতার পর, মাদাম তাকাদা আমার পক্ষ হয়ে বিনয়ের সঙ্গে অন্য নারীদের দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি তাদের বললেন, ‘যারা এখানকার আবহাওয়ায় অভ্যস্ত নয়, তাদের জন্য মে মাসের এই গরম অসহনীয় লাগছে। গরমে সহজেই ক্লান্তি চলে আসছে।’

মাদাম তাকাদা, যার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে, চুলে রুপালি আভা দেখা দিচ্ছিল। শারীরিক গঠনের দিক থেকে তিনি একদিকে যেমন স্থূলকায়, তেমনি মনের দিক থেকে উদার। আমি শুনলাম, তিনি কাগশিমার পুরনো সামুরাই পরিবারের সন্তান—আমার মতোই কিউশুর বাসিন্দা।

আমাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, ‘চলুন, আজকের জন্য এসব আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিই। আমার পরিবারের সঙ্গে শহরে গেলে কেমন হয়? তাইচুর বিনোদন কেন্দ্রে আমেরিকান সিনেমা দেখানো হয় এবং সেখানে এসির (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ) ব্যবস্থা আছে। গ্রীষ্মকালের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি জায়গা ওটা।’

‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গা?’ আমি চিৎকার করে উঠলাম। ‘দ্বীপটি দেখছি অবিশ্বাস্য সুন্দর!’ মাদাম তাকাদা মুচকি হাসলেন। ‘জাপানিরা সবসময় মনে করে এই দ্বীপটি বুঝি কোনো আদিম অনগ্রসর এলাকা! এমনকি চিজুকো-সেনসেই ইজো এবং রিউকু ভ্রমণের পরও যদি এমনটা ভাবেন, তাহলে আমরা নিরুপায়।’

আমি লজ্জা পেয়ে হাসলাম। ‘দুঃখিত, আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম, তাইওয়ানে—মানে এই দ্বীপে আসার আগে এই এলাকা সম্পর্কে আমি বিচ্ছিন্ন কিছু ভ্রমণকাহিনি পড়েছিলাম। জায়গাটা সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই কম। এমনকি আমি এ-ও ভেবেছিলাম, তাইচুতে থেকে পশ্চিম উপকূলের সব শহরে রেলপথে সহজেই যাতায়াত করতে পারব। পূর্ব উপকূলে হয়তো পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এমনটা ভাবাটা কি ধৃষ্টতা ছিল?’

‘চিজুকো-সেনসেই, আপনি খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েছেন। আপনি ধৃষ্টতা দেখাননি। উত্তরের কীরুন এলাকা থেকে শুরু করে দক্ষিণের তাকাও পর্যন্ত তেরোটি বড় স্টেশন রয়েছে। আমরা অবশ্যই এই তেরোটি শহরের সব জায়গাতেই আপনার বক্তৃতার আয়োজন করতে পারি। কিন্তু এ নিয়ে আরও কথা বলার আগে’, তিনি হেসে বললেন, ‘কিছু খেয়ে নেওয়া কি ভালো হবে না?’ জোরে শূন্য পেটে হাত চেপে আমি বললাম, ‘আহ্ আ।’ ‘লজ্জার হলেও আমি স্বীকার করছি আমি বেশ পেটুক।’

‘ক্ষমা চাইবেন না। আপনি খাবার বেশ উপভোগ করছেন দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে।’

তার হাসি আরও গভীর ও রহস্যময় হয়ে উঠল। ‘মিশিমা-সান আমাকে জানিয়েছিলেন আপনি এই দ্বীপের খাবারের স্বাদ নিতে চান। আমি তাই তাইচু শহর থেকে একটি বিশেষ খাবার আনিয়েছি। কিন্তু এই খাবার আমার পরিবার আমাকে খেতে দেয় না, নিষেধ আছে!’

তাই নাকি! আমার বেশ খুশি খুশি লাগছে। আমি ঝট করে তাকাদাদের পশ্চিমা ধাঁচের ডাইনিং রুমে ঢুকলাম এবং সুন্দর মেহগনি টেবিলের ওপর সোনা দিয়ে নকশা করা একটি চমৎকার কালো বার্নিশ করা বাক্স দেখতে পেলাম। বাক্সটির চারপাশে ছোট ছোট প্লেট এবং বাটি সাজানো। সম্পূর্ণ জাপানি কায়দার আয়োজন।

বিস্ময়ের ধাক্কায় আমার শরীর যেন জমে শক্ত হয়ে গেল। ‘ওয়াও, ভাতের ওপর উনাগি, মানে ইল মাছ! এটা কি এই দ্বীপের নিজস্ব বন্য ইল মাছ দিয়ে তৈরি!’ মাদাম তাকাদা যেন কোনো উপহারের রহস্য উন্মোচন করছেন সেভাবে খাবারের পাত্রের ঢাকনাটি তুললেন, তার মুখে শিশুর সরল হাসি। ‘এটি আমার পরমপ্রিয় খাবার। চিজুকো-সেনসেই, আপনি কি এই উনাগি পছন্দ করেন?’ সেই সময়, আমি আসলে কী বলতে পারতাম? ‘হ্যাঁ—আমি এটি খুব ভালোবাসি।’

‘আহা, আপনার চোখ দেখি আনন্দে জ্বলজ্বল করছে!’

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে।’

(প্রথম অধ্যায়ের অংশবিশেষ)