প্রচ্ছদ রচনা

কবিতার দুর্বোধ্যতা : অবগুণ্ঠনের শিল্পকলা

শিল্পকলায় দুর্বোধ্যতা এক উচ্চমার্গীয় রাজনীতি। একদিকে তা সামাজিক আপত্তি ঠেকানোর কৌশল, অন্যদিকে জনরুচির চাপ থেকে আত্মরক্ষার অনুশীলন। এর মূলে রয়েছে চেনা দুনিয়ার গড্ডলিকা থেকে মুক্তির অভিপ্রায় আর অচেনা জগতের ওপর শিল্পীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। — লেখক

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

দুর্বোধ্যতার ‘অভিযোগ’ কবিতা সম্পর্কে প্রায় সবসময়ই ছিল। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের ইতিহাস তাতে কম-বেশি স্পন্দমান। বাংলা কবিতার আদিপর্ব থেকে ছিল এমন অভিযোগ, খ্রিস্টীয় আনুমানিক অষ্টম-দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত চর্যাপদ সে সময়েই দুর্বোধ্য ছিল; সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিত মুনি দত্তর টীকা না-থাকলে সেগুলোর মর্মবস্তু সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন, হয়তো অসম্ভব হতো। চর্যাপদ যতটা দুর্বোধ্য, ততটার বেশি রহস্যময়। এর প্রধান কারণ সে-কালের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। সহজিয়া বৌদ্ধদের প্রতি অপ্রসন্ন ব্রাহ্মণদের প্রতিহিংসা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য কবিরা লিখেছিলেন এমন এক আড়ালব্যঞ্জক ভাষায়—যাতে ইঙ্গিত, ‘প্রতীক’ ও রূপকের আশ্রয়ে রহস্যময়তা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে চর্যাপদ হয়ে উঠেছে তখনকার অবরুদ্ধ সমাজের দ্যোতক। কেমন সেই কবিতা? একটি উদাহরণ :

‘টালত ঘর মোর নাহি পড়িবেষী।
হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।
বেঙ্গ সংসার বডহিল যায়।
দুহিল দধু কি বেণ্টে ষামায়।।
বলদ বিআঅল গবিআ বাঁঝে।
পিটা দুহিএ এ তিনা সাঁঝে।।
জো সো বুধী শোই নিবুধী।
জো সো চোর সোই সাধী।।
নিতি নিতি ষিআলা ষিহে সম জুঝঅ।
ঢেণ্টনপায়ের গীত বিরলে বুঝঅ।’

পদটির শেষে বলে দেওয়া হয়েছে যে, ঢেণ্টনপাদের কথা খুব কম লোকেই বুঝতে পারে। বোঝা যাচ্ছে, পদকর্তা জারি রেখেছেন তাঁর সেই প্রি-অকুপেশন, যাতে রচনাটি সমাজের বিপুল-গরিষ্ঠদের কাছে বোধগম্য না-হয়ে ওঠে। দরিদ্র গৃহিণীর কষ্টকর জীবন পরস্পরবিরোধী ইঙ্গিত-রূপকে চিত্রণের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনার গূঢ় তত্ত্ব এ-রচনায় প্রতিপাদন করা হয়েছে। যেমন—টিলার ওপরে ঘর চেতনাশীর্ষেরই দ্যোতক। চেতনার চূড়ায় উঠলে কী ঘটে, কী দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ইত্যাদি বলিয়ে নেওয়ার জন্য এমন একজনকে নির্বাচন করা হয়েছে, ব্রাহ্মণ এবং তাদের অনুগতদের রোষানলে কবিকে যেন পড়তে না হয়। আর ভাষা তো পূর্বনির্ধারিত অস্পষ্টতায় জড়ানো, যাকে ‘সন্ধ্যাভাষা’ বলে দুর্বোধ্যতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। তবে অভিযোগবাচক এই রূপকটিকে সেই অর্থে গ্রহণ করার আগে, এর বিকল্প কিংবা প্রায়-সমার্থক ইংরেজি পারিভাষিক শব্দগুলো সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা থাকা দরকার। ভাবা যেতে পারে, এগুলো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থেকে সৃষ্ট একেকটি ধরন; কিন্তু আদৌ তা নয়। সাধারণভাবে, কবিতার দুর্বোধ্যতা প্রধানত তিন প্রকার : সহজাত [Inherent], অর্জিত [Acquired] ও আরোপিত বা কৃত্রিম [Imposed ev Artificial]। প্রথমটি বিষয়ের গভীরতা বা চিন্তার জটিলতা থেকে সৃষ্ট; পরেরটির উৎস প্রচলিত ভাষার সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের জন্য কবির দীর্ঘ অনুশীলন [ভাবসংহতি, নতুন রূপক ও প্রতীক, বক্রোক্তি, সঙ্কেত ইত্যাদির মাধ্যমে আড়ালব্যঞ্জক অর্থ ও সৌন্দর্য সৃষ্টির চর্চা] এবং শেষেরটির কারণ দুরূহ শব্দের প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা, ব্যক্তিগত প্রতীক, অসংলগ্ন বাক্য, আঙ্গিক-নিরীক্ষায় জবরদস্তি ইত্যাদি। তবে এই তিন প্রকারের বাইরে আরেক ধরনের দুর্বোধ্যতা লক্ষ করা যায়—যার জন্য কবি কিংবা পাঠক কেউই দায়ী নন। উভয়ের সাংস্কৃতিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও ভাষাবোধের মধ্যে সাময়িক অসংযোগ, বিচ্ছিন্নতা বা দূরত্বের কারণে এমনটা ঘটে। [অনুবাদকদের এমন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় বেশি; সমাধানের উদ্দেশ্যে তারা ফুটনোট প্রণয়ন করেন]। তীব্র অথচ ব্যাখ্যার অতীত কোনো আবেগ বা নতুন উপলব্ধি প্রকাশ করতে গিয়ে কবি প্রায়শ ভাষার সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন। এই চাপ থেকে উত্তরণের অনুশীলনে বা চেষ্টায় নির্মিত হয়ে যায় এমন এক ভাষাপরিধি, পাঠক তাৎক্ষণিকভাবে তাতে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। তবে এ ধরনের দুর্বোধ্যতা খুব দীর্ঘস্থায়ী কিছু নয়। এ-রকম কোনো কবিতা সম্পর্কে পাঠকসমাজে আলাপ চলতে থাকলে একসময় সেটি বোধগম্য হয়ে ওঠে। এর কারণ জীবনধারার পরিবর্তন, জ্ঞানের বিকাশ এবং ভাষার গতিশীলতা। কিন্তু প্রথম বা শুরুর দিককার একাধিক পাঠের অভিজ্ঞতায়, লালনের ‘অনামক অচিনায় বচন বাগেন্দ্রিয় না সম্ভবে’ কথাটি প্রযোজ্য হতে পারে, যাতে ভাষার সীমাবব্ধতা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য অর্থ—অচিহ্নিত বাক্য চিনিয়ে দেওয়া ভাষায় সম্ভব নয়। একে সাময়িক অসংযোগজাত [Temporary Non-Attachment] দুর্বোধ্যতা বলা যেতে পারে। তবে কবিতার দুর্বোধ্যতার প্রকারভেদ অন্যভাবেও হতে পারে; যেমন—১. ভাষাগত [অপ্রচলিত শব্দ বা জটিল বাক্যগঠনের ফলে সৃষ্ট], ২. কাঠামোজাত [আঙ্গিকের অভিনবত্বহেতু], ৩. বিষয়/ভাবমূলক [আড়ালব্যঞ্জক প্রতিতুলনা, রূপক ও প্রতীকের প্রয়োগে বিষয় বা ভাব যখন অম্পষ্ট], ৪. দার্শনিক কিংবা তাত্ত্বিক [বিমূর্ত ধারণা কিংবা গভীর দার্শনিক চিন্তাপ্রসূত] এবং ৫. জ্ঞানগত [পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক বিশেষ কোনো বিষয় বা অনুষঙ্গ থেকে উদ্ভূত]।

দুর্বোধ্যতার ইংরেজি পারিভাষিক শব্দগুচ্ছে রয়েছে বৈচিত্র্য; সেগুলোর অর্থ, প্রকৃতি ও প্রয়োগ কোনোটাই এক রকম নয়। যেমন—১. Ambiguity : দ্ব্যর্থকতা বা একাধিক অর্থ থাকার কারণে সৃষ্ট অস্পষ্টতা; ২. Esotericism : যা কেবল বিশেষজ্ঞ কিংবা পণ্ডিতদের জন্য বোধগম্য; ৩. Incomprehensibility : একেবারেই বোঝা যায় না বা অবোধ্য এবং ৪. Hermeticism : অত্যন্ত জটিল এবং গূঢ় প্রতীকী। এগুলোর সমার্থক ও প্রায়-বিকল্প আরও কিছু পারিভাষিক শব্দ ব্যবহৃত হতে দেখা যায় ইংরেজি সাহিত্যের বিশ্লেষণ ও সমালোচনায়। বিদ্যমান প্রসঙ্গে সেগুলোর অবতারণা আসন্ন।

প্রথমটিতে শনাক্ত করা যায় না প্রতিপাদ্য কিংবা ভাব; তবে অনুভব করা যায় একাধিক অর্থ বা ব্যাখ্যার সম্ভাবনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটিকে অসচেতনতার ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়; কিন্ত বহু উদাহরণ রয়েছে, যেগুলো কবির শৈল্পিক অনুশীলন এবং সহজাত সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ। যেমন—‘শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে’ [‘বনলতা সেন’] পঙ্‌ক্তিটির রয়েছে একাধিক অনিশ্চিত অর্থ ও ব্যাখ্যা : দিন ও রাতের এই সন্ধিক্ষণে শিশিরপতনের শব্দ অবাস্তব; সন্ধ্যার আগমনের শব্দও কল্পনামাত্র। শিশিরের শব্দ অদৃশ্য আর সন্ধ্যা দৃশ্যমান, কিন্তু শ্রবণাতীত। পঙ্‌ক্তিটি এসেছে সম্ভবত ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার বৈপরীত্য ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা থেকে। যা শ্রুত হয় না, তা শুনতে চাওয়ার মানসিক চাপ এর কারণ হতে পারে। এটা ভাবাও অসমীচীন নয় যে, সন্ধ্যার আগমনের নীরবতা বোধগম্য করে তোলার জন্য শিশিরের শব্দের প্রতিতুলনা ব্যবহৃত হয়েছে। আরেকটি সম্ভাব্য বার্তা হলো, শিশিরের মতোই সন্ধ্যা ক্ষণস্থায়ী; বা, হতে পারে—সন্ধ্যার যে অস্পষ্টতা, শিশিরের শব্দের কল্পনায় তা পাঠকের অনুভূতিতে সঞ্চারিত করার প্রণোদনা পঙ্‌ক্তিটিতে স্পন্দমান।  

‘ইসোটারিসিজম’ হলো নির্দিষ্ট বা বিশেষ কোনো আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত জ্ঞান, কবিতায় এর প্রভাব বা প্রকাশ ঘটলে তা পাঠকের অগম্য হয়ে ওঠে। গূঢ়তাজনিত দুর্বোধ্য [Esoteric] কবিতার সেরা নিদর্শন চর্যাপদ; যেমন—

‘নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোঁহোরি কুড়িয়া।
ছোই ছোই যাহসি বামহণ নাড়িয়া।।’
[১০ম চর্যা, কাহ্নপাদ]

এর বাক্যিক অর্থ হলো নগরের বাইরে এক ডোম নারীর কুঁড়েঘর, যাকে ছোঁয়া নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের জন্য নিষিদ্ধ। এখানে ‘ডোম্বি’ বা ডোম নারী আসলে নৈরাত্মা বা পরম জ্ঞান। ‘ব্রাহ্মণ’ হলো প্রচলিত শাস্ত্রীয় আচার। কবি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন, পরম জ্ঞান লাভ করতে হলে প্রচলিত নিয়মের বাইরে যেতে হয়। এই অর্থ তার অগম্য, তান্ত্রিক বৌদ্ধ সহজিয়াদের গোপন সাধনার সংকেত ও পদ্ধতি সম্পর্কে যার কোনো ধারণা নেই।

‘ইনকম্প্রিহেন্সিবিলিটি’ হচ্ছে ব্যবহৃত শব্দ অথবা বাক্যের কাঠিন্য বা দুরূহতা ও নিরীক্ষাধর্মী আঙ্গিকজনিত অস্পষ্টতা। যেমন—
‘Altarwise by owl-light in the half-way house > The gentleman lay graveward with his foetus.’ [Altarwise by Owl-light, Dylan Thomas]। পঙ্‌ক্তিটির অনুবাদ : ‘আবছা আলোয় বেদির মতো মধ্যপথের ঘরে কবরের দিকে শুয়েছিল এক ভদ্রলোক, সঙ্গে ছিল তার ভ্রূণ।’ এখানে ‘Altarwise’ [এটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে উৎসর্গের ইঙ্গিত দেয়, বেদির মতোই; যদিও এর সাধারণ অর্থ ভিন্ন উপায়ে জ্ঞানী, যেমন—কবি, সন্ত], ‘owl-light’ [গোধূলি বা অস্পষ্ট আলো কিংবা আবছা সময়], ‘half-way house’ [জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী স্থান; তবে প্রচলিত অর্থে এটি এমন এক অন্তর্বর্তী আবাসস্থল—কারামুক্ত ব্যক্তি, মাদকাসক্ত বা মানসিক রোগীদের মূল সমাজে ফিরিয়ে নেওয়ার আগে যেখানে রাখা হয়] এবং ‘graveward with his foetus.’ [জন্ম, জীবন ও মৃত্যুকে একবিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে এতে] শব্দবন্ধ ও বাক্যাংশ থেকে সৃষ্ট আবহ সাধারণ যুক্তিতে বোধগম্য হওয়ার কথা নয়।

‘হার্মেটিসিজম’ বলতে বোঝায় এমন এক কবিতাশৈলী, যাতে রহস্যময় রূপক, জটিল প্রতীক এবং দূরবর্তী, সম্পর্কহীন ও পরস্পরবিরোধী অনুষঙ্গ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ‘সত্য’কে লুকিয়ে রাখার প্রয়াস করা হয়। এই টার্মে ভাষাও নিবিড়বিবেচ্য, যেখানে শব্দের অর্থকে অভিধান থেকে মুক্তির অনুশীলন চলে। ‘In every bosom a Universe expands as an Ocean, whose tides admit no navigation.’ [The Marriage of Heaven and Hell, William Blake] এর বিখ্যাত একটি উদাহরণ। পঙ্‌ক্তিটির অনুবাদ এ-রকম : ‘প্রতিটি বুকের মধ্যে মহাবিশ্ব ছড়িয়ে রয়েছে সমুদ্রের মতো, যার জোয়ার-ভাটায় কোনো দিকনির্ণয় চলে না।’ কেন এটি দুর্বোধ্য? এই পঙ্‌ক্তিতে মানুষের অন্তর্সত্তাকে [Microcosm] এক বিশাল মহাবিশ্বের [Macrocosm] সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের ভেতর রয়েছে অসীম এক জগৎ, যা সাধারণ যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। হারমেটিক দর্শনের মূলনীতিকে এই পঙ্‌ক্তি ধারণ করে, যেখানে মানুষের আত্মাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিচ্ছবি বলে মনে করা হয়।

অন্যদিকে, বাংলা পারিভাষিক শব্দ হিসেবে দুর্বোধ্যতা আর রহস্যময়তা প্রায়ই সমার্থক নয়। রহস্যময়তা হলো কবির সেই সচেতন চর্চা, যার অভিপ্রায় ভাববস্তু আড়ালে রেখে তাতে গভীরতা সৃষ্টি করা; বা, প্রতীকের মধ্যে এমন এক আপাত অর্থ লুকিয়ে রাখা, যা আবিষ্কারের জন্য পাঠক ব্যগ্র হয়ে ওঠেন। এটি কবিতার একটি নান্দনিক কৌশল। উদ্দেশ্য, পাঠকের মনে কৌতূহল জাগিয়ে দেওয়া। অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতার মধ্যে পার্থক্য সামান্য [ইংরেজিতে যেমন ‘Ambiguity’র সঙ্গে ‘Obscurity’, ‘Abstruse’, ‘Enigmatic’, ‘Arcane’ ইত্যাদির ব্যবধান নির্দেশ গবেষণাসাপেক্ষ]; তবে দুটোই ত্রুটি বা দোষ কিংবা সমস্যা অথবা সীমাবদ্ধতা হিসেবে যুগের পর যুগ বিবেচিত হয়ে এসেছে এই কারণ দেখিয়ে যে, কবিতা নামের রচনাকে তা শব্দগুচ্ছের নিরর্থক প্রদর্শনীতে পরিণত করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, কবিতার দুর্বোধ্যতা কী? আধুনিক ও উত্তরাধুনিক সাহিত্যের আলাপে এর ইংরেজি পারিভাষিক ‘Inscrutability’ এবং ‘Opacity’ শব্দ দুটি অর্থের স্পষ্টতার অভাব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। স্বচ্ছতার অনুপস্থিতি কিংবা অর্থোদ্ধার কঠিন হওয়া শুধু নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি হতে পারে ইতিবাচক মান এবং বিভিন্ন গুণের সমষ্টি—যা উপলব্ধির জন্য পাঠকের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর বিশেষ জ্ঞান থাকা দরকার।

শুরুতে কবিতার অস্পষ্টতা, রহস্য, জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা ছিল প্রায়-সমার্থক এবং বেজায় নিন্দাসূচক। কালক্রমে এই চারের পার্থক্য স্পষ্ট হতে থাকে এবং নিজস্ব অর্থবৈশিষ্ট্য নিয়ে পরস্পর সম্পর্কিতও হয়ে পড়ে। ফলে বেশিরভাগ সমালোচনায় দেখা দেয় অস্পষ্টতা, জটিলতা ও রহস্যময়তাকে কবিতার দুর্বোধ্যতার কারণ বলে গণ্য করার মনোভাব। এর পেছনে প্রধানত উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে আবির্ভূত ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের ভূমিকা প্রাতঃস্মরণীয়। মূলত তখন থেকে দুর্বোধ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া পারিভাষিক শব্দগুলোর উর্ধ্বতাপ্রাপ্তি বা ‘জাতে ওঠা’র শুরু। বিশ শতকে এর তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রধানত টি. এস. এলিয়টের [১৮৮৮-১৯৬৫] প্রবন্ধ ‘দ্য মেটাফিজিক্যাল পোয়েট্স্’ [১৯২১] থেকে; যদিও ২৪ বছর আগে স্তেফান মালার্মের [১৮৪২-’৯৮] ডিভ্যাগেশন্স গদ্যসংকলনে অন্তর্ভুক্ত ‘ক্রাইস দে ভার্স’ [‘Crisis In Poetry’] শীর্ষক রচনায় দুর্বোধ্যতার পক্ষে অবস্থান সুস্পষ্ট। পরবর্তীকালে প্রধানত যেসব গ্রন্থের ওপর ভর করে এটি কবিতার নান্দনিক [রাজনৈতিকও বটে] গুণ [কিংবা কৌশল] হিসেবে প্রতিভাত হওয়ার পরিসর বিস্তৃত করতে থাকে, সেগুলো হলো—আই. এ. রিচার্ডসের [১৮৯৩-১৯৭৯] প্রাক্টিক্যাল ক্রিটিসিজম [১৯২৯], উহলিয়াম এম্পসনের [১৯০৬-১৯৮৪] সেভেন টাইপস্ অব অ্যাম্বিগুইটি [১৯৩০], রোলাঁ বার্থের [১৯১৫-’৮০] রাইটিং ডিগ্রি জিরো [১৯৫৩], জীবনানন্দ দাশের [১৮৯৯-১৯৫৪] কবিতার কথা [১৯৫৫] এবং থিওডর অ্যাডর্নোর [১৯০৩-’৬৯] এইসথেটিক থিওরি [১৯৭০]। যুগের পর যুগ কবিতার নিন্দাসূচক বৈশিষ্ট্যরূপে যা বিবেচিত হয়ে আসছিল, উল্লিখিত গ্রন্থগুলোর বদৌলতে তা হয়ে উঠল শংসাব্যঞ্জক ও প্রায়-আবশ্যকীয় শৈল্পিক শর্ত। কীভাবে, সে-প্রসঙ্গ বর্তমান আলাপের অন্যত্র রয়েছে। যা হোক, কবিতা সম্পর্কে আলোচ্য ‘সমস্যা’ [সম্ভাবনাও বটে] বা অভিযোগের ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে রয়েছে এতক্ষণের বর্ণিত অস্পষ্টতা, রহস্যময়তা এবং দুর্বোধ্যতার মধ্যে পার্থক্য ও সংযোগ বুঝতে না-পারার সম্পর্ক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত