আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় বাতিল করা হলো রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা থেকে দেওয়া এক আদেশে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের কথা জানানো হয়েছে। তবে ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে উপযুক্ত বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা। গতকাল হাসপাতালটির সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি দেখা গেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে দেওয়া লাইসেন্স বাতিল আদেশের চিঠিতে বলা হয়, ‘ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত যে জবাব ও ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, তাহা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় ‘চিকিৎসা অনুশীলন এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও পরীক্ষাগার (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হইল। ওই অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।’

এই হাসপাতালটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। ছয় শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে মাঠে সক্রিয় দেখা যায় জামায়াতসংশ্লিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরকে।

ছয় নবজাতকের মৃত্যু দায়ে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্ট অনেকেই সরকারের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ‘ছয় নবজাতকের অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হয়েছে। তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় পেয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে। আমি মনে করি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ প্রশংসীয়। উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর এর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে হাসপাতাটির দায় প্রমাণিত হয়। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি অসংগতি পায় তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে, ভবনটি হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়। আদ্্-দ্বীন কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তাদের প্রতিবেদন গত ২ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেয়।

এরপর গত ৪ জুন ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ মর্মে তিন দিন সময় দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এ ঘটনায় মৃত এক নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল গত ৩০ মে ওই হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রশাসনিক ভবনে বেকারির কারখানা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেদিন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মিডিয়া কর্মীদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। ৩১ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে নানা ধরনের অসংগতি পেয়ে হাসপাতালটিকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করেন।

হাসপাতালটির পক্ষে রাজধানীর একটি বিলাসবহুল হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির মৃত ছয় নবজাতকের প্রতি পরিবারকে হাসপাতালের পক্ষ ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণসহ অন্য আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এদিকে লাইসেন্স বাতিলের চিঠি দেওয়ার পর প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন হাসপাতালটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। 

আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীদের স্বার্থে হাসপাতালের নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্তমানে ৪১৬ রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া এনআইসিইউতে ৬০ জন নবজাতক শিশু, আইসিইউতে ২০ এবং সিসিইউতে চারজন রোগী ভর্তি রয়েছে।