টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে পূর্বশর্ত একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠন। সে জন্য সরকার পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। সেগুলো হলো সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ; চিকিৎসা-কেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রূপান্তর; গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া; মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদারকরণ; স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো। এই বিষয়গুলো সামনে রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আজ দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, আর বিপুল সংখ্যক রোগী বিদেশমুখী হওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে। জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করতে প্রতি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি বলেন, সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে; করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকবে। রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন করা হবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআই-ভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে; দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং নার্সিং বিষয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তি পকেট থেকে খরচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনসাধারণের চিকিৎসা খরচ কমানোর লক্ষ্যে আমদানিকৃত হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের সরবরাহের ক্ষেত্রে জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতিটি হার্টের রিং বা স্টেন্ট-এর মূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে। চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের মূল্য প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, বাজেটে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আরোপিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধার কারণে কিডনি রোগীর প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে এই শিল্পের অতিপ্রয়োজনীয় কতিপয় কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যকিছু কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করার এবং এই সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ওষুধ শিল্পের অধিকতর প্রসারকল্পে স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদনের লক্ষ্যে এপিআই তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুন করে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সরকার স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছে। সেই লক্ষ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ১.০১ শতাংশে উন্নীত করা হচ্ছে; যা একটি জনমুখী, দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যৎমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গঠনের সূচনা করবে।