বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘ ২৪ বছরের সোনালি ট্রফি খরা। ২০০২ সালে ইয়োকোহামার মাঠে রোনালদো নাজারিওর সেই অতিমানবীয় জাদুতে পঞ্চম তারকা এসেছিল হলদে জার্সিতে। তারপর? প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসেছে, সাম্বার ছন্দ চেনা ঢেউ তুলেছে ফুটবলপ্রেমীদের বুকে, কিন্তু বিশ্বমঞ্চের সোনালি ট্রফিটা যেন এক মরীচিকা হয়েই রয়ে গেছে। প্রতিবারই যেন কোয়ার্টার ফাইনালের সেই চেনা জুজু এসে থামিয়ে দিয়েছে সেলেসাওদের। তবে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার আঙিনায় এবার ব্রাজিল পা রাখছে এক ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মনস্তত্ত্বে। যেখানে পেলের ‘জোগা বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের দর্শনের সঙ্গে মিশে গেছে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির ক্ষুরধার রণকৌশল।
এবারের হেক্সা মিশনের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক এবং নাটকীয় মোড় ড্রেসিংরুমে ৩৪ বছর বয়সী কিংবদন্তি নেইমারের প্রত্যাবর্তন। চোটের দীর্ঘ ধকল আর প্রায় তিন বছর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে দূরে থাকার পর যখন স্কোয়াডে তার নাম দেখা গেল, অনেকেই ভ্রƒ কুঁচকেছিলেন। কিন্তু ব্রাজিলের সাবেক ও বর্তমান ফুটবলারদের কথায় স্পষ্ট, নেইমার এখন আর কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি এই তরুণ দলটির আত্মবিশ্বাসের বাতিঘর।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক রবার্তো কার্লোস নেইমারের এই উপস্থিতি নিয়ে এক ভিন্ন দিক উন্মোচন করেছেন। কার্লোসের মতে, নেইমারের অবদান এখন আর কেবল মাঠের ৯০ মিনিটের ড্রিবলিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখতে হবে নেইমার শতভাগ ফিট হতে পারছেন কি না। তবে দল তাকে চায়, সে খেলুক আর না খেলুক। কারণ ডাগআউটে বা বেঞ্চে তার উপস্থিতিটাই দলের তরুণদের ভেতর অন্যরকম মানসিক শক্তি জোগায়। আর সে যদি একবার মাঠে নামে, তবে সেটা তো স্রেফ এক জাদুকরী প্রদর্শনী।’
ড্রেসিংরুমের এই মানসিক পরিবর্তন মাঠের পারফরম্যান্সে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা স্পষ্ট মাঝমাঠের নতুন ইঞ্জিন ব্রুনো গিমারাইসের কথাতেও। কিংবদন্তি ক্যাসেমিরো যাকে ডিলান করেছেন নিজের উত্তরসূরি হিসেবে, সেই গিমারাইস এবার আনচেলত্তির আস্থার অন্যতম প্রতীক। এদিকে গিমারাইস মেতেছেন কোচের বন্দনায়, ‘তিনি এমন একজন কোচ যিনি ড্রেসিংরুম সামলাতে সবচেয়ে ওস্তাদ। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, আমি কোথায় খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি তা জেনেছেন। এই স্বাধীনতাই আমাকে সেরাটা দিতে সাহায্য করছে।’ নেইমারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গিমারাইসের সরল স্বীকারোক্তি, ‘সেলেসাও জার্সিতে নেইমারের থাকাটা কখনোই চমক নয়। সে এক অনন্য তারকা, আমরা বিশ্বাস করি তার প্রতিভা আমাদের এই ট্রফি খরা কাটাতে মূল ভূমিকা রাখবে।’
তবে নেইমার যদি হন ড্রেসিংরুমের অভিভাবক, তবে মাঠের গতি নির্ধারণের বাটনটা এবার তরুণ তুর্কিদের হাতে। বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ কাঁপানো ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং বার্সেলোনার রাফিনহা। যদিও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমটা ভিনির জন্য কিছুটা অমøমধুর ছিল, তবুও তার ওপর শতভাগ বাজি ধরছেন খোদ তার ক্লাব-রাইভাল রাফিনহা।
রাফিনহা এক সাক্ষাৎকারে নিজের এবং ভিনিসিয়ুসের কাঁধে থাকা গুরুদায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ভিনি তরুণ হতে পারে, কিন্তু ওর যে অভিজ্ঞতা আর অর্জন, ও একাই বিশ্বকাপের একটা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে এবং দেশের জন্য ষষ্ঠ শিরোপা এনে দিতে পারে। আমি নিজেকেও এই দায়িত্বের অংশ মনে করি।’ তবে আনচেলত্তির অধীনে আক্রমণাত্মক ফুটবলের স্বপ্ন দেখলেও রাফিনহা মনে করিয়ে দিয়েছেন ট্রফি জেতার আসল চাবিকাঠি, ‘আমাদের রক্ষণভাগকে কঠিন করতে হবে। যদি আমরা ঠিকঠাক ডিফেন্ড করতে পারি, আমাদের জেতার সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে। কারণ বিশ্বকাপ খুবই সংক্ষিপ্ত এবং নিষ্ঠুর এক টুর্নামেন্ট, এখানে ভুল করার কোনো সুযোগ নেই।’
ব্রাজিলে ফুটবল কোনো খেলা নয়, এটি এক অলিখিত ধর্ম। দূরবর্তী বাংলাদেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন আবেগও নিয়ন্ত্রিত হয় এই হলুদ জার্সির জয়-পরাজয়ে। দীর্ঘ দুই যুগের ট্রফি খরা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের আসল বাণিজ্যিক ও রোমাঞ্চকর আকর্ষণ এখনো এই সাম্বা দলটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আনচেলত্তির নিখুঁত ছক, সাবেক কিংবদন্তিদের প্রবল বিশ্বাস এবং ভিনি-রাফিনহাদের আগুনে ফর্মের সঙ্গে যদি নেইমারের ‘লাস্ট ডান্স’ মিলে যায়, তবে উত্তর আমেরিকার প্রতিটি স্টেডিয়াম রূপ নেবে এক একটি ক্রুদ্ধ হলুদ সমুদ্রে। সেখানে প্রতিপক্ষের জন্য টিকে