মণিপুরে অপহৃত ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে অপহৃত নাগা সম্প্রদায়ের ছয়জনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় এক মাস আগে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হওয়া এসব ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের খবর প্রকাশের পর রাজ্যজুড়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। গত বুধবার রাজ্য পুলিশ জানায়, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নাগা সম্প্রদায়ের ওই ছয়জনকে গত ১৩ মে মণিপুরের কাংপোকপি জেলার লেইলোন ভাইপেই গ্রাম থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মণিপুর পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ৪৫০ জন নিরাপত্তাকর্মী, বিশেষ অনুসন্ধান দল এবং স্নাইফার ডগের সহায়তায় টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানের ফলেই নিখোঁজ ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। তবে কারা এই অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা মণিপুরের চলমান জাতিগত সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারগুলোর অভিযোগ, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা ওই যুবকদের অপহরণের পর হত্যা করেছে। লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগাঅধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সেনাপতি ও উখরুলসহ একাধিক জেলায় যানবাহনে আগুন দেওয়া এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। রাজধানী ইম্ফলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জওহরলাল নেহরু মেডিকেল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের বাইরে বিপুল মানুষের জড়ো হওয়ার পর অতিরিক্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। ২০২৩ সালের মে মাসে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, ভূমির অধিকার এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ সুবিধাকে কেন্দ্র করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় ও খ্রিস্টান কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয় এবং রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, যখন এক নাগা ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে কিছু কুকি ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর মণিপুরের তৃতীয় বৃহৎ জাতিগত গোষ্ঠী নাগারাও সংঘাতের আবহে সরাসরি প্রভাবিত হতে শুরু করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শুরু হওয়া সহিংসতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২৬০ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে মণিপুরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। সর্বশেষ এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মণিপুরে জাতিগত সম্প্রীতি ও শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।