বিশ্বে প্রতি ৭০ জনে একজন জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের কারণে বর্তমানে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্বের প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে একজন এখন বাস্তুচ্যুত। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা প্রায় ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির শিকার শরণার্থীদের সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি বলে ইউএনএইচসিআর এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে ৫৪ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে শরণার্থী বা শরণার্থীসদৃশ পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৬ লাখে। এদের মধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ৬০ লাখ। একই সময়ে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ দেশে বা এলাকায় ফিরে গেছেন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেশি এবং ১৯৬৫ সালের পর ইউএনএইচসিআর-এর রেকর্ড করা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা। ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের ৯২ শতাংশই ছয়টি দেশের নাগরিক। দেশগুলো হলো ডিআর কঙ্গো (৩৬ লাখ), সুদান (৩৫ লাখ), সিরিয়া (৩৩ লাখ), আফগানিস্তান (২০ লাখ), ইউক্রেন (৭,১৮,৩০০) ও মিয়ানমার (৪,১৫,২০০) ।

তবে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলোর অভাব, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং চলমান নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে; যা এই প্রত্যাবর্তনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছ। ২০২৫ সালে প্রায় ২৯ লাখ আফগান নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন, যার মধ্যে ১৯ লাখই শরণার্থী। এই সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি সংকটে থাকা সিরিয়ায় ২০২৫ সালে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ফিরে গেছেন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখ থেকে কমে ৪৭ লাখে দাঁড়িয়েছে।

তবে নতুন কিছু ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে পরিস্থিতি এখনো বেশ জটিল। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে ইরান ও লেবানন অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে লেবাননে ১০ লক্ষাধিক এবং ইরানে ৩২ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউএনএইচসিআর-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৬৮.৬ মিলিয়ন (৬ কোটি ৮৬ লাখ) নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত (আইডিপি), ২৮.৫ মিলিয়ন ইউএনএইচসিআর-এর ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা শরণার্থী, ৯ মিলিয়ন বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের অপেক্ষায় থাকা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী, ৬ মিলিয়ন ইউএনআরডব্লিউএ-এর অধীনে থাকা ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং ৭.২ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন থাকা অন্যান্য মানুষ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বের মোট শরণার্থীর প্রায় ৭২ শতাংশেরই উৎস মাত্র ৭টি দেশ। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভেনিজুয়েলা (৬.৪ মিলিয়ন), ফিলিস্তিন (৬ মিলিয়ন), ইউক্রেন (৫.২ মিলিয়ন) এবং সিরিয়া (৪.৯ মিলিয়ন)।

অন্যদিকে, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্র ৭টি দেশ। সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে কলম্বিয়া (২.৮ মিলিয়ন)। এর পরেই রয়েছে জার্মানি (২.৭ মিলিয়ন), তুরস্ক (২.৪ মিলিয়ন), উগান্ডা (১.৯ মিলিয়ন) এবং ইরান (১.৭ মিলিয়ন)। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ শরণার্থীই তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত