পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশ্বের শীর্ষ জলবায়ু বিজ্ঞানীদের এক যৌথ গবেষণায় এমনই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্যসহ বিশ্বের ৭০ জনের বেশি বিজ্ঞানী গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বার্ষিক যৌথ গবেষণায় জানিয়েছেন পৃথিবীর উষ্ণতা একদিকে যেমন তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রে তাপপ্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অর্থায়নে কাটছাঁটের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা পর্যবেক্ষণের প্রচেষ্টা হুমকির মুখে পড়তে পারে। আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডেটা সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যার মধ্যে ১.৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের জন্যই দায়ী মানুষের নানা কর্মকাণ্ড। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই মানবসৃষ্ট এই উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছুঁয়ে ফেলবে।
এর প্রায় পুরো অংশই মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল। বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাতিরিক্ত নিঃসরণ উষ্ণায়নের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত তাপ শোষণ করছে। ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঘটনাও বেড়ে চলেছে। গত এক শতাব্দীর বেশি সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। জলবায়ু পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত উপগ্রহ, সমুদ্রভিত্তিক যন্ত্র ও অন্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়লে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার কাজ আরও কঠিন হয়ে যাবে। গবেষণার সহলেখক ও আয়ারল্যান্ডের মেয়নুথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার থর্ন বলেন, এসব সূচক মূলত একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের মতো, যার উপসর্গ দিন দিন আরও উদ্বেগজনক মাত্রায় বাড়ছে। জাতিসংঘ সমর্থিত পৃথিবী পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি গ্লোবাল ক্লাইমেট অবজারভিং সিস্টেমের (জিসিওএস) ডেপুটি চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন থর্ন। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথম দেখছি, বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাগুলো হয় পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে, নয়তো সেগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।’
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে এবং সম্ভব হলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলো এড়ানো। গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাপ সঞ্চয় করছে। এর ফলে ‘পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা’ আরও বাড়ছে। এর অর্থ হলো পৃথিবীতে যে পরিমাণ রোদ বা তাপ ঢুকছে, সেই তুলনায় বাইরে বের হতে পারছে না। ফলে ভেতরেই তাপ আটকে থেকে পৃথিবী দ্রুত গরম হয়ে উঠছে। যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটির জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক পিয়ার্স ফরস্টার বলেন, মানুষ পরিবেশ নষ্ট না করলে এই ভারসাম্য স্বাভাবিক থাকত। কিন্তু ১৯৭০-এর দশক থেকে ভারসাম্যহীনতা ক্রমাগত বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তা দ্বিগুণ হয়ে এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। পৃথিবী দ্রুত উষ্ণ হওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, কলকারখানা ও গাড়ি থেকে নির্গত গ্রিনহাউজ গ্যাস ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙেছে। দ্বিতীয়ত, বাতাস থেকে অ্যারোসল বা ধূলিকণার মতো দূষণরোধী উপাদান কমে গেছে। এই ধূলিকণাগুলো আগে আয়নার মতো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে কিছুটা ঠা-া রাখত, এখন সেই ঠা-া রাখার ক্ষমতা কমে গেছে।
ইরান যুদ্ধের ‘আফটারশক’
ইরান যুদ্ধ ১০০ দিন পার করার পর বিশ্বজুড়ে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এই যুদ্ধ মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার গতিপ্রকৃতিতে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে দিচ্ছে। চলতি সপ্তাহে জার্মানির বনে চলমান জাতিসংঘের মধ্যবর্তী জলবায়ু আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে এই যুদ্ধকালীন সংকটকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ৩১’-এর আয়োজক দেশ তুরস্ক গত মঙ্গলবার কিছু নতুন উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে অন্যতম লক্ষ্য হলো, ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট বৈশ্বিক জ¦ালানি চাহিদার ৩৫ শতাংশই যেন বিদ্যুৎ থেকে মেটানো সম্ভব হয়।