অর্থনীতির সূচকে অবনতি ঋণের বোঝা বেড়েছে

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের অরাজকতা, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। বিএনপি সরকার সর্বশেষ ক্ষমতায় আসে ২০০১ সালে। সে সময় থেকে বর্তমান সময়ে দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত আর্থনীতির এই বেহাল দশা হয়েছে বলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন।

বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে পরে তা কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়।

অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান, সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও কাক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন বলে দাবি করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বাজেট বক্তৃতায়। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

এছাড়া ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০০৫ সালের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের শেষে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহেও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, স্ক্যাম ও ভুল নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে এবং বাজার কার্যত দুর্বল অবস্থায় পৌঁছেছে।

দেশের ঋণ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে দলটি জানায়, ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের সরকারের সময় ৬৫ হাজার কোটি টাকা থাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ বর্তমানে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ১৬ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। সুদ ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সরকারের সুদ ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকির অবস্থান ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির পর্যায়ে নেমে এসেছে।

সংসদ অধিবেশনে বাণিজ্য খাতেও দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ এবং ১২ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উভয় সূচকের প্রবৃদ্ধিই ঋণাত্মক অবস্থানে চলে যায়।

অন্যদিকে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ২০০৫-০৬ সালে ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে। টাকার এই অবমূল্যায়ন বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

সামগ্রিকভাবে অর্থমন্ত্রী মনে করেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অবনতি, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।