বয়সের ছাপ মুছে দিতে পারে এমন চিকিৎসার মানব পরীক্ষা শুরু

মানুষের বার্ধক্যকে পেছনে ফেলে যৌবন পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিলেন বিজ্ঞানীরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনভিত্তিক বায়োটেকনোলজি কোম্পানি ‘লাইফ বায়োসায়েন্সেস’ বার্ধক্যজনিত সমস্যা দূরীকরণে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা শুরু করেছে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘ইআর-১০০’ নামের এই পরীক্ষামূলক চিকিৎসা পদ্ধতিটি মূলত গ্লুকোমা এবং বয়সজনিত চোখের স্নায়ুর ক্ষতির শিকার রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, বয়সের ভারে নিস্তেজ হয়ে পড়া কোষগুলোকে পুনরায় কর্মক্ষম করে তোলা এবং হারানো দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা।

সম্প্রতি এই ট্রায়ালের আওতায় একজন রোগীর চোখে প্রথমবারের মতো এই বিশেষ জিন থেরাপির ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২০ জনেরও কম রোগীর ওপর এই পরীক্ষা চালানো হবে। বোস্টন, নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং চার্লসটনের বিভিন্ন ক্লিনিকে এই ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিসিস্ট ডেভিড সিনক্লেয়ারের ‘ইনফরমেশন থিওরি অফ এজিং’ বা বার্ধক্য সম্পর্কিত তথ্য তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে এই চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোষগুলো সময়ের সঙ্গে তাদের কাজের সঠিক নির্দেশিকা হারিয়ে ফেলে, যার ফলে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে।

ইআর-১০০ প্রযুক্তির মাধ্যমে জিনের পরিবর্তনের সাহায্যে কোষগুলোকে পুনরায় যৌবনের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এর প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

১. ইনজেকশন: রোগীর চোখে সরাসরি একটি জিন থেরাপির ইনজেকশন দেওয়া হয়।

২. অ্যাক্টিভেশন: কয়েক সপ্তাহ ধরে রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়, যা শরীরের ভেতরে তিনটি থেরাপিউটিক জিনকে চালু করার ‘অন সুইচ’ হিসেবে কাজ করে।

৩. পরীক্ষার ফলাফল: এর আগে ইঁদুর এবং বানরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে বয়স্ক প্রাণীদের অপটিক নার্ভের সংযোগ পুনর্গঠিত হয়েছে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছে।

কোষের এই বিশেষ রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ২০০৬ ও ২০০৭ সালে জাপানি বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকার আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, চারটি প্রোটিনের (যাকে ইয়ামানাকা ফ্যাক্টর বলা হয়) সাহায্যে বয়স্ক কোষকে স্টেম সেলে রূপান্তর করা সম্ভব। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ২০১২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান।

তবে কোষকে পুরোপুরি স্টেম সেলে পরিণত করলে সেটি শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে টিউমার বা ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে বিজ্ঞানীরা ‘পার্শিয়াল রিপোগ্রামিং’ বা আংশিক রূপান্তর পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে কোষের মূল পরিচয় ঠিক রেখে শুধুমাত্র তার বয়সকে কমিয়ে যৌবনাবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, এই ট্রায়ালটি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, জিন যদি অতিরিক্ত সময় সক্রিয় থাকে, তবে কোষগুলো তাদের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে পারে, যা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

এ কারণেই এই প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূল লক্ষ্য রাখা হয়েছে নিরাপত্তার ওপর। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে চাইছেন যে, এই পদ্ধতি মানুষের শরীরে কতটা নিরাপদ। এই পরীক্ষা সফল হলে ভবিষ্যতে আলঝেইমার, আর্থ্রাইটিস এবং হৃদরোগের মতো বয়সজনিত জটিল রোগ নিরাময়েও নতুন দুয়ার খুলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গবেষকরা আগামী কয়েক মাস নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন যে, এই চিকিৎসা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে কতটা কার্যকরী এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা শেষ পর্যন্ত মানুষের আয়ু এবং সুস্থতা বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সূত্র: এনডিটিভি