বিদ্যুৎমন্ত্রী বললেন

‘বৈষম্যমূলক’ চুক্তির বোঝা বহন করছে সরকার

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের সরকারের করা চুক্তিগুলোর কারণে বর্তমান সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তার দাবি, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা অনেক চুক্তি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে করা হয়েছিল, যেখানে সরকারের পক্ষে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ ও ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। এসব চুক্তির কারণে সরকার বিদ্যুৎ না কিনলেও নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেও ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রী বলেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন উপেক্ষা করে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জসংক্রান্ত বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে মতামতের জন্য বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাতের কয়েকটি প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রায় পাঁচ লাখ ডিজিটাল মিটার কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু আনা মিটারের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে, বাকিগুলো গুদামে পড়ে আছে। একই সময়ে আরও মিটার আমদানির প্রক্রিয়াও চলমান ছিল। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাতিল করলেও ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে, আবার চালিয়ে নিলেও আর্থিক চাপ বাড়ছে। ফলে সরকারকে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি) প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়নের প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। অথচ একই প্রকল্পের আওতায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তার মতে, প্রকল্পের অনেক অংশ ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ বাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। ফলে মাঝপথে বন্ধ করলে আগের ব্যয় করা অর্থও অপচয় হবে।

দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স-কে সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য নতুন রিগ সংগ্রহসহ স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বাপেক্সের অভিজ্ঞতা সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্প্রতি সমুদ্র ব্লক ইজারার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়তে সময় লাগবে। এর মধ্যে জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে কিছু সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে।

তার দাবি, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল সংগ্রহ করেছে।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকদের কাছে কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া ছিল। এ বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি চলমান বিল পরিশোধ করাও সরকারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা।

তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে নানা মত থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। সরকার এ খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে।