বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল করার এক উচ্চাভিলাষী মহাপ্রকল্প এবং জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেছেন। শুক্রবার (১২ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই বাজেট নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট কোনোভাবেই জাতির বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন নয়, বরং এটি একটি ঘাটতিনির্ভর ফাঁপা বাজেট।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, গালভরা এই বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ঘাটতি ধরা হয়েছে, তা পূরণের জন্য সরকার বৈদেশিক দাসত্ব এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর দেদারসে হাত বাড়াবে।
ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার অর্থ হলো, বেসরকারি খাতের গলা টিপে ধরা, দেশীয় বিনিয়োগকে স্থবির করে দেওয়া এবং জনগণের আমানতকে ঝুঁকিতে ফেলা। অর্থনীতিকে সচল রাখার নামে সরকার দেশকে দীর্ঘমেয়াদী দাসত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার চড়া মূল্য দিতে হবে খেটে খাওয়া আমজনগণকে।
মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার রূপকথা শোনায়, তখন তা বাজার বাস্তবতায় জনগণের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো শোনায়। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের যে দানবীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আদায়ের চাবুক চালানো হবে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের পিঠে। এটি ধনীদের আরও ধনী এবং দরিদ্রদের আরও নিঃস্ব করার একটি পুঁজিপতিবান্ধব দলিল।
বাজেট বরাদ্দের সমালোচনা করে খেলাফত মজলিস আমির বলেন, কৃষি খাতে মাত্র ২৭ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে কৃষকদের সাথে তামাশা করা হয়েছে। অন্যদিকে জননিরাপত্তার নামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটা কি কৃষিকে বাঁচানোর বাজেট, নাকি আমলাতান্ত্রিক শাসনযন্ত্রকে চাঙ্গা রাখার বাজেট?
শিক্ষা খাতের বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগকে মাত্র ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর দ্বীনি ও কর্মমুখী শিক্ষার এই খাতকে চরম অবহেলা করা হয়েছে। নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এই বাজেট কতটা গণবিচ্ছিন্ন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঐতিহাসিক আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারসহ বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে নিহত বহু শহীদের আত্মত্যাগকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের ভূত এখনো বাজেট প্রণেতাদের ঘাড় থেকে নামেনি।
অবিলম্বে কৃষি, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, অর্থপাচারকারী, ব্যাংকডাকাত ও ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে শাস্তি প্রদান, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং শাপলা চত্বরের শহীদ পরিবারসহ সব শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনে পৃথক বিশেষ বরাদ্দ সংযোজনের দাবি জানান তিনি। অন্যথায় এই মেগা-বাজেট জনআকাঙ্ক্ষার মরণফাঁদ হিসেবে ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন মামুনুল হক।