১৭ মিনিটের গোলে এগিয়ে থাকা সুইজারল্যান্ড যখন রেফারির শেষ বাঁশির অপেক্ষায় ছিল, ঠিক তখনই আচমকা গোল কাতারের! ইনজুরি টাইমের একদম শেষ মুহূর্তে ডিফেন্ডার বুয়ালেম খুউখির অবিশ্বাস্য হেডার স্তব্ধ করে দিল পুরো সুইস শিবিরকে। আর তাতেই গ্রুপ ‘বি’-এর ফেভারিট সুইজারল্যান্ডের মুখ থেকে জয় কেড়ে নিয়ে ১-১ ব্যবধানের এক রূপকথার ড্র উল্লাসে মাতল কাতার।
ক্যালিফোর্নিয়ার লিভাইস স্টেডিয়ামে প্রায় ৬৮ হাজার দর্শকের সামনে কাতার শুধু ম্যাচটাই ড্র করেনি, বরং নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপে প্রথম কোনো পয়েন্ট পাওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করল। অন্যদিকে, নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হওয়াকে সুইস পাবলিক ব্রডকাস্টার 'আরটিএস' তাদের হেডলাইনে কাতারেস্ট্রফি" (কাতার বিপর্যয়) বলে আখ্যা দিয়েছে।
ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য কাতার সুইস ডিফেন্ডার ম্যানুয়েল আকাঞ্জির ভুল থেকে গোল করার একটি সুযোগ পেয়েছিল। তবে এদমিলসন জুনিয়রের সেই শট সহজেই লুফে নেন সুইস কিপার গ্রেগর কোবেল।
এর পরপরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সুইজারল্যান্ডের হাতে। ১৩ মিনিটে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোর পাস থেকে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়া রেমো ফ্রয়লারকে ফাউল করেন কাতারের গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদা। রেফারি সাথে সাথেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
অফসাইডের জন্য দীর্ঘ সময় ভিএআর রিভিউ এবং গোলরক্ষকের চিকিৎসার কারণে খেলা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। অবশেষে ১৭ মিনিটের মাথায় ঠাণ্ডা মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন রেনের স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো। ভিসা জটিলতা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই এই গোল করলেন তিনি।
প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে মিশেল এবিশারের একটি নিশ্চিত শট কাতারের ডিফেন্ডাররা গোললাইন থেকে ক্লিয়ার না করলে ব্যবধান তখনই দ্বিগুণ হতে পারত।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ক্যালিফোর্নিয়ার তীব্র গরমের কারণে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেই ক্লান্তি ভাব দেখা যায়। খেলার গতি কমে আসায় রেফারি অফিশিয়াল হাইড্রেশন ব্রেক দিতে বাধ্য হন।
ম্যাচের ৭৫ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন এমবোলো, তাঁর শট লাগে সাইড-নেটে। একটু পর বদলি নামা জোহান মাঞ্জাম্বির শটও পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া করার চড়া মূল্য যে দিতে হবে, তা হয়তো ভাবতেও পারেনি সুইসরা।
ঘড়ির কাঁটা তখন ৯০ মিনিট পার করে যোগ করা সময়ে। সুইসরা যখন ৩ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ার প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই ৯৪ মিনিটে আসে সেই স্তব্ধ করে দেওয়া মুহূর্ত।
কাতারের লেফট-ব্যাক হোমাম আল আমিন চমৎকারভাবে ওভারল্যাপ করে সুইজারল্যান্ডের ডি-বক্সে একটি ক্রস বাড়ান। সুইস ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে কাতার অধিনায়ক বুয়ালেম খুউখি লাফিয়ে উঠে এক বুলেট হেডারে বল জাল জড়িয়ে দেন! সুইস গোলরক্ষক কোবেলের তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
সমতায় ফেরার সাথে সাথেই কাতারের ডাগআউটে শুরু হয় বন্য উল্লাস। খেলোয়াড়রা মাঠেই শুয়ে পড়ে ঐতিহাসিক এই অর্জন উদযাপন করতে থাকেন।
ম্যাচ শেষে চরম হতাশ সুইস অধিনায়ক ও মিডফিল্ডার গ্রানিত জাকা বলেন:"এই ড্র-টি আমাদের কাছে হারের মতোই মনে হচ্ছে। আজ আমাদের পারফরম্যান্স ম্যাচ জেতার মতো যথেষ্ট ভালো ছিল না।"
অন্যদিকে কাতারের স্প্যানিশ কোচ হুলেন লোপেতেগি তাঁর দলের শৃঙ্খলা ও লড়াই করার মানসিকতার প্রশংসা করে বলেন, 'আজ আমি আমার ছেলেদের নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল, তারা তা মাঠে বাস্তবায়ন করেছে। ফুটবলে বা জীবনে কিছুটা ভাগ্যের ছোঁয়া লাগে, কিন্তু তার জন্য আগে বিশ্বাসটা রাখতে হয়।"
গ্রুপের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী সুইজারল্যান্ডের মুখ থেকে শেষ মুহূর্তে পয়েন্ট কেড়ে নিয়ে কাতার বুঝিয়ে দিল, ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা স্রেফ সংখ্যা পূরণের দল হয়ে আসেনি।