নজিরবিহীন এক শুরুর একাদশ, তীব্র গরম, দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব আর সেই সাথে প্রতিপক্ষের দুর্দান্ত ফুটবল—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম পদক্ষেপটি হলো বেশ নড়বড়ে।
গ্রুপ ‘সি’-এর উদ্বোধনী ম্যাচে মরক্কোর সাথে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছেড়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিলকে এক প্রকার ‘একাই’ টেনে তুললেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাঁর একক নৈপুণ্যে করা গোলেই শেষ পর্যন্ত হারের লজ্জা বাচাতে পেরেছে সেলেসাওরা।
শুরুতেই ভুল পাসের মহড়া ও মরক্কোর আঘাত
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই কার্লো আনচেলত্তির অধীনে এক অদ্ভুত ব্রাজিলকে দেখল ফুটবল বিশ্ব। ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিলের খেলায় ছন্দের চরম অভাব ছিল। রক্ষণভাগ থেকে বল নিয়ে আক্রমণভাগে যাওয়ার কোনো গোছানো পরিকল্পনাই দেখা যায়নি; উল্টো একের পর এক ভুল পাসে বল হারাচ্ছিল সেলেসাওরা।
ম্যাচের শুরুর দিকেই গোল করার প্রথম সুবর্ণ সুযোগটি পেয়েছিল ব্রাজিল। বাঁ দিক থেকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের চমৎকার ক্রস ডি-বক্সে খুঁজে পেয়েছিল ইগর থিয়াগোকে। কিন্তু সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও শট মিস করেন এই প্রিমিয়ার লিগ ফরোয়ার্ড।
সেই ভুলের খেসারত দিতে হয় কিছুক্ষণ পরেই। মাঝমাঠ ও ব্রাজিলের রক্ষণভাগের মধ্যকার বিশাল ফাঁকা জায়গাকে কাজে লাগান মরক্কোর রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ব্রাহিম দিয়াজ। তাঁর বাড়ানো এক জাদুকরী পাস খুঁজে নেয় ইসমায়েল সাইবারিকে। ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডার মার্কিনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালাসকে বোকা বানিয়ে, এগিয়ে আসা গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়ান সাইবারি। মরক্কো এগিয়ে যায় ১-০ ব্যবধানে।
আনচেলত্তির কৌশল বদল ও ভিনির ম্যাজিক
পিছিয়ে পড়ার পর ব্রাজিল দল যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, ঠিক তখনই ক্যালিফোর্নিয়ার তীব্র গরমের কারণে রেফারি ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ (পানি পানের বিরতি) দেন। এই বিরতিটি ব্রাজিলের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। কোচ আনচেলত্তি তাঁর ৪-২-৪ ফরমেশন বদলে দলটিকে ৪-২-৩-১-এ সাজান। রাফিনহাকে ডানে পাঠিয়ে লুকাস পাকেতাকে মাঝমাঠে নিয়ে আসা হয়।
কৌশলের এই পরিবর্তনের পরপরই আসে কাঙ্ক্ষিত সেই গোল- মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারেসের পাস থেকে বাঁ দিকে বল পান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। নিজের চিরচেনা গতি ও ড্রিবলিংয়ে মরক্কোর ডিফেন্স ভেঙে এক বুলেট গতির কোনাকুনি শটে পরাস্ত করেন মরক্কোর তারকা কিপার ইয়াসিন বোনোকে। ১-১ সমতায় ফেরে ব্রাজিল। এর কিছুক্ষণ পর পাকেতার এক দুর্দান্ত ভলি গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে না গেলে প্রথমার্ধেই লিড নিতে পারত তারা।
দ্বিতীয়ার্ধ: একের পর এক বদলি ও অ্যালিসনের দেয়াল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই হলুদ কার্ড দেখা ইবানেজ ও ক্যাসেমিরোকে তুলে নিয়ে দানিলো ও ফাবিনহোকে মাঠে নামান আনচেলত্তি। পরে পাকেতা ও ইগর থিয়াগোর জায়গায় নামানো হয় লুইজ হেনরিকে ও ম্যাথিউস কুনহাকে। এই পরিবর্তনের পর ব্রাজিল আক্রমণের ধার কিছুটা বাড়ালেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না।
ম্যাচের ১৫ মিনিট বাকি থাকতে বার্সেলোনা তারকা রাফিনহা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। ভিনির বাড়ানো ক্রস ফাঁকায় পেয়েও দুর্বল শট মারেন তিনি, যা সহজেই লুফে নেন বোনো।
ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে মরক্কো কাউন্টার অ্যাটাক থেকে প্রায় জিতেই যাচ্ছিল। তবে দূর থেকে নেওয়া একটি জোরালো শট এবং ফিরতি বলের রিবাউন্ড শট—পরপর দুইবার চমত্কার দক্ষতায় আটকে দিয়ে ব্রাজিলের নিশ্চিত হার বাঁচিয়ে দেন গোলরক্ষক অ্যালিসন।
বিশ্বকাপের নিয়মানুযায়ী সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও পরের রাউন্ডে যাবে, তাই ব্রাজিলের নকআউট পর্বে যাওয়া হয়তো আটকাবে না। তবে গ্রুপের প্রথম স্থান ধরে রাখতে হলে ব্রাজিলের এই খেলার ধরনে অনেক উন্নতি করতে হবে।
ব্রাজিলের পরবর্তী ম্যাচ ১৯ জুন, বাংলাদেশ সময় সকাল ৭:৩০ মিনিটে (ফিল্মিডেলফিয়া)। শীর্ষস্থান এবং গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার জন্য এই ম্যাচে ব্রাজিলের বড় জয়ের কোনো বিকল্প নেই।