কেঁচো সারে বদলে যাচ্ছে কৃষি

জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে কৃষি খাত যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন কুড়িগ্রামে কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট। পরিবেশবান্ধব এই জৈবসার মাটির স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনে খরচ কমিয়ে কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে।

সরেজমিনে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ম-লপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কৃষক সাজু ম-ল চার বছর আগে নিজের জমির জন্য সীমিত পরিসরে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন। ভালো ফলন ও চাহিদার কারণে বর্তমানে তার উদ্যোগ বাণিজ্যিক খামারে রূপ নিয়েছে। কেঁচো ও গোবরের সমন্বয়ে তৈরি এই জৈবসার এখন তার আয়ের অন্যতম উৎস। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ১৫ টন কেঁচো সার মজুদ রয়েছে।

কৃষক সাজু ম-ল বলেন, ‘প্রথমে নিজের জমিতে ব্যবহার করার জন্য কেঁচো সার তৈরি করতাম। পরে এর সুফল দেখে উৎপাদন বাড়াই। এখন নিজের চাহিদা মিটিয়ে অন্য কৃষকদের কাছেও বিক্রি করছি। এতে খরচ কমছে, লাভও হচ্ছে।’ তার সফলতা দেখে আশপাশের অনেক কৃষকও কেঁচো সার উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলে জানান তিনি। সাজু ম-ল বলেন, কেঁচো সার উৎপাদন করতে হলে প্রথমে একটি উপযুক্ত বেড বা সেট তৈরি করতে হবে। এরপর অনলাইন কিংবা কোনো খামার থেকে ভালো জাতের কেঁচো সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে প্রতি কেজি কেঁচোর দাম প্রায় ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। কেঁচো ছাড়ার আগে গরুর গোবর ১৫ থেকে ২০ দিন ভালোভাবে পচিয়ে নিতে হয়। এরপর সেই গোবরের মধ্যে কেঁচো ছেড়ে দিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, তবে খেয়াল রাখতে হবে, গোবরে যেন কোনো ধরনের গ্যাস সৃষ্টি না হয়। সাধারণত ১ কেজি কেঁচো ৫ থেকে ৬ মণ গোবরে ব্যবহার করা যায়। এভাবে পরিচর্যা করলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই উন্নত মানের কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট প্রস্তুত হয়।

রাজারহাট উপজেলার ম-ল পাড়া এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমার এলাকার সাজু ম-ল চার বছর ধরে কেঁচো ও গরুর গোবর দিয়ে জৈব সার তৈরি করে নিজের জমিতে দিচ্ছেন, আবার বিক্রিও করছেন। তার দেখাদেখি আমিও জৈব সার তৈরি করে আমার জমিতে দিচ্ছি। ফলন ভালো হচ্ছে। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে করার চিন্তা ভাবনা আছে।’

সাজু ম-লের মতো সফল কৃষকদের উদ্যোগ ইতিমধ্যেই জেলার অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। পরিবেশবান্ধব, লাভজনক এবং টেকসই হওয়ায় কেঁচো সার উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে কুড়িগ্রামের আরও অনেক কৃষক। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জেলার কৃষিতে জৈবসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন ফসল ও সবজি উৎপাদনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার জন্য  জৈবসারের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দিন দিন বাড়ছে ভার্মি কম্পোস্টের ব্যবহার ও উৎপাদন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মামুনা রাব্বি মালিহা বলেন, ‘ভার্মি কম্পোস্ট মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি করে এবং মাটির গঠন উন্নত করে। এতে ফসলের উৎপাদন ভালো হয় এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব। কৃষকদের  জৈবসার ব্যবহারে আমরা নিয়মিত উৎসাহিত করছি।’

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও পিএইচ মাত্রা কমে গিয়ে মাটিতে অমøতা বা এসিডিটি সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উদ্ভিদ স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না এবং ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়।’ তিনি আরও বলেন, শুধু ফলন বৃদ্ধির আশায় দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে জমির স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং কৃষি উৎপাদন টেকসই থাকে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেঁচো সার, কম্পোস্ট সারসহ বিভিন্ন ধরনের জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। জৈব সার মাটির গুণাগুণ উন্নত করে, পরিবেশ রক্ষা করে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে। তিনি কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, আমরা রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করি। এতে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমবে।’