যে দেশে গ্যাং লিডাররাও ফুটবল ভালোবাসে

২০০৪ সালের কথা। হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্স তখন গৃহযুদ্ধে থমথমে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে সেখানে পা রাখল তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো আর রবার্তো কার্লোসদের এক নজর দেখতে রাস্তায় নামল হাজার হাজার মানুষ। দুই দিনের জন্য থমকে গেল সব হিংসা, অস্ত্র ছেড়ে শান্তির বার্তা দিল যূথবদ্ধ গ্যাংগুলো। সাংবাদিক পিয়েরে রিচার্ড মিডি সেদিনের স্মৃতি আউড়ে বলেন, ‘চারপাশে তখন কেবল শান্তির সুবাতাস। গ্যাংগুলো যেন দুই দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে জীবনের নতুন পাতা ওল্টাতে প্রস্তুত ছিল।’

দীর্ঘ ৫২ বছর পর (সর্বশেষ ১৯৭৪ সালে) হাইতি এবার যখন আবারও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে, তখন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে গ্রুপ পর্বেই তাদের প্রতিপক্ষ সেই ব্রাজিল! গ্রুপ ‘সি’-তে তাদের বাকি দুই প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড ও মরক্কো। বিদ্যুৎ সংকটে জর্জরিত দেশটিতে সোলার প্যানেল আর জেনারেটর ধার করে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে মানুষ। হাইতিয়ানদের কাছে এবারের বিশ্বকাপ কোনো স্কোরলাইনের লড়াই নয়; এটি কেবলই বেঁচে থাকার এবং শান্তির এক বুক আশা।

২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প আর ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মইসের হত্যাকাণ্ডের পর হাইতি এখন পুরোপুরি গ্যাংদের দখলে। কেবল ২০২৪ সালেই দেশটিতে ৫,৬০০ মানুষ খুন হয়েছে। এতটাই বিপজ্জনক পরিস্থিতি যে, বিগত ৫ বছর ধরে জাতীয় দল নিজেদের দেশে কোনো ম্যাচ খেলতে পারেনি। রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের যে স্টেডিয়ামে খেলা হতো, সেটি এখন গ্যাংদের আস্তানা! এমনকি ঘরোয়া লিগের ফাইনাল ম্যাচটিও শুরু করতে হয়েছিল গুলির শব্দ মাথায় নিয়ে।

দলটির প্রধান কোচ সেবাস্তিয়ান মিগনে কোনোদিন হাইতির মাটিতে পা-ই রাখেননি! ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ১৬ জনই জন্মেছেন বিদেশে। ১৫টি দেশের ২৫টি ক্লাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেলেন তারা।

দলের একমাত্র ঘরোয়া ফুটবলার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার উডেন্সকি পিয়েরে। হাইতির অন্যতম বিপজ্জনক বস্তি ‘সিতে সোলেইল’-এ বেড়ে ওঠা এই ফুটবলারকে কোচ দলে নিয়েছেন কেবল অনলাইনের ভিডিও দেখে। সাংবাদিক মিডি বলেন, ‘উডেন্সকি আমাদের জন্য অমূল্য। ও শুধু বল পায়ে দৌড়ায় না, ও আমাদের মতো ভাগ্যাহত মানুষের স্বপ্ন বয়ে বেড়ায়।’ দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ডাকেন্স নাজোন মনে করেন, উডেন্সকি তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বড় উদাহরণ। অস্ত্র হাতে তুলে না নিয়েও যে জীবন গড়া যায়, তা উডেন্সকি প্রমাণ করেছে।

দলের ডিফেন্ডার হানেস ডেলক্রোয়ার গল্পটা আরও আবেগের। দুই বছর বয়সে এক বেলজিয়াম পরিবার তাকে দত্তক নেয়। বড় হয়ে বেলজিয়াম জাতীয় দলের হয়ে একটি ম্যাচও খেলেন তিনি। কিন্তু ২০১৫ সালে হঠাৎ নিজের জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজ পাওয়ার পর, ২০২৫ সালে ডেলক্রোয়া সিদ্ধান্ত নেন নিজের আসল জন্মভূমি হাইতির হয়ে খেলার। ২৭ বছর বয়সী বার্নলির এই সাবেক ডিফেন্ডার বলেন, ‘হাইতি দলের সঙ্গে থাকা আমাকে আমার সংস্কৃতি ও ভাষা বুঝতে সাহায্য করছে।’

গত বছর ১৮ নভেম্বর ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হাইতির ঐতিহাসিক দাস বিদ্রোহের দিনে দলটি বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। সেই যুদ্ধজয়ের ছবি জার্সিতে রেখে বিশ্বকাপে নামতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তা নিষিদ্ধ হওয়ার ফিফার নিয়মের কারণে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র দুই দিন আগে জার্সি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় তারা।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ হাইতিয়ান প্রবাসীর সমর্থনে আগামীকাল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে হাইতির বিশ্বকাপ অভিযান। এরপরই চেনা প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। স্ট্রাইকার নাজোন বলেন, ‘আগে দেশের মানুষ নিজেদের গর্ব করার কিছু না পেয়ে ব্রাজিলকে সমর্থন করত। কিন্তু এবার আমাদের নিজেদের দল আছে। মানুষ ব্রাজিলকে ভালোবাসতেই পারে, তবে এবার পুরো দেশ গলা ফাটাবে শুধু আমাদের জন্য।’