নাইজেরিয়ানের আমেরিকা জয়

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম

লস অ্যাঞ্জেলেসের সুবিশাল স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার। মাঠের কোনায় দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে সেই উন্মাদনা উপভোগ করছেন এক তরুণ। তিনি ফোলারিন বালোগান। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের বিধ্বংসী জয় দিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর ঘরের মাঠে ৩২ বছর পর বিশ্বকাপের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের মহানায়ক আর কেউ নন, খোদ বালোগান। অভিষেক ম্যাচেই দুর্দান্ত এক জোড়া গোল করে তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ইতিহাসের নতুন পোস্টার বয়।

ম্যাচের ৩১ মিনিটে অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচের নিখুঁত ক্রস থেকে দারুণ ফিনিশিংয়ে নিজের প্রথম গোলটি করেন বালোগান। তবে আসল জাদু বাকি ছিল প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে। প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডারকে অনবদ্য ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে দূরপাল্লার এক বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান তিনি। এই জোড়া গোল কেবল প্যারাগুয়েকে ম্যাচ থেকে ছিটকেই দেয়নি, বরং কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর নতুন আক্রমণাত্মক কৌশলে বালোগানকে দলের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কাতার বিশ্বকাপে গোল খরায় ভোগা যুক্তরাষ্ট্র যে এবার ঘরের মাঠে বিশ্বকে কাঁপাতে প্রস্তুত, বালোগানের বুট তারই জানান দিল।

বালোগানের এই নায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা কিন্তু সহজ ছিল না। এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও কঠিন সব সিদ্ধান্তের সমীকরণ। ২০০১ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে নাইজেরিয়ান দম্পতির ঘরে জন্ম নেন বালোগান। তবে মাত্র দুই বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে পাড়ি জমান লন্ডনে। ফলে তার সামনে নাগরিকত্বের তিনটি বিকল্প খোলা ছিল, জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্র, বেড়ে ওঠার কারণে ইংল্যান্ড, আর মা-বাবার সূত্রে নাইজেরিয়া।

লন্ডনে ফুটবলের হাতেখড়ি হওয়া বালোগান মাত্র আট বছর বয়সে যোগ দেন আর্সেনালের বিখ্যাত ‘হেল এন্ড’ একাডেমিতে। সেখানে তার গতি ও গোল করার সহজাত ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করে। ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে অনূর্ধ্ব-২১ দল পর্যন্ত নিয়মিত খেলেন তিনি। তবে আর্সেনালের মূল দলে পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়ায় ধারে খেলতে যান ফরাসি ক্লাব রাঁসে। সেখানে এক মৌসুমে ২১ গোল করে ইউরোপীয় ফুটবলের নজর কাড়েন এবং পরবর্তী সময়ে এএস মোনাকোতে স্থায়ীভাবে যোগ দেন ২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

যুক্তরাষ্ট্র দলে বালোগানের অভিষেকটা ২০২৩ সালে। সেখানে এখন পর্যন্ত ২৮ ম্যাচ খেলে করেন ১১ গোল। যার মধ্যে বিশ্বকাপে নিজের অভিষেকে করেন জোড়া গোল। এমন কীর্তির পর ম্যাচ শেষে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বালোগান বলেন, ‘এটি এমন একটি রাত যা আমি দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্নে দেখেছি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডায় ছুটি কাটানোর সময় মার্কিন সমর্থকদের ভালোবাসা আমার মন ছুঁয়ে যায়। আজ এই বড় মঞ্চে পারফর্ম করে সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পেরে আমি গর্বিত।’

মাঠের ভেতরে বালোগান যতটাই আক্রমণাত্মক এবং ক্ষুরধার, মাঠের বাইরে তিনি ততটাই শান্ত ও সাধারণ। লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্ল্যামারাস স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে যখন টম ক্রুজ, ডেভিড বেকহ্যামের মতো তারকারা তার জন্য তালি বাজাচ্ছেন, ম্যাচ শেষে বালোগানের উদযাপন ছিল একদম সাদামাটা। এত বড় জয়ের পর কোনো জমকালো পার্টিতে না গিয়ে তিনি জানান, হোটেলে ফিরে সাধারণভাবে ‘নেটফ্লিক্স’ দেখেই রাতটি কাটাতে চান। এছাড়া ম্যাচের অনুভূতি প্রসঙ্গে বলেন, ‘ম্যাচ শেষের এই পুরো অনুভূতিটা এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি। আমি নিশ্চিত, যখন হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নেব, তখন এই মুহূর্তটি নিয়ে ভাবার সুযোগ পাব এবং বুঝতে পারব রাতটি আসলে কতটা অসাধারণ ছিল।’

যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ইতিহাসে এই জয়টি একটি নতুন যুগের সূচনা। মাউরিসিও পচেত্তিনোর অধীনে একটি গতিশীল ও সৃজনশীল দলের ‘নাম্বার নাইন’ বা প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে বালোগান নিজেকে শতভাগ প্রমাণ করেছেন। এমনকি ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এক ম্যাচে জোড়া গোলের কীর্তি এখন কেবল বালোগানেরই। তাই তো দলের জন্য এমন কীর্তিতে তার বন্দনায় মেতেছেন কোচ পচেত্তিনো। তবে বালোগানের পারফর্ম ছাড়া দলীয় পারফর্মেও বেশ খুশি এই আর্জেন্টাইন কোচ। ‘কেবল বালোগান বা আলাদা কোনো খেলোয়াড়ই দারুণ খেলেছে এমন নয়। আমার মনে হয় পুরো দলটাই অসাধারণ পারফর্ম করেছে।’

ডাক হর্স যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তাদের পরের ম্যাচ খেলবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে, ১৯ জুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত