বইচিত্র

ইলিয়াসের কথাসাহিত্যের অন্তর্জগৎ অন্বেষণ

সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা সমাজ—কোনোটিই স্থির নয়; এগুলো নিরন্তর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়। এই পরিবর্তন একরৈখিক নয়, বহুমাত্রিক। কোথাও কোথাও অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার প্রবণতা কাজ করে, আবার কোথাও সেই পরিবর্তন নানা দিক ও গতিপথে বিস্তৃত হয়। সমাজের ভেতরে বিদ্যমান স্বার্থসংঘাত, ভিন্ন ভিন্ন শক্তির টানাপড়েন এবং বহুস্রোতের উপস্থিতিই এই বৈচিত্র্যময় গতিশীলতার জন্ম দেয়। শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম ও গোষ্ঠীভিত্তিক বৈষম্য ও নিপীড়নে গঠিত সমাজে ক্ষমতাবান শ্রেণিই সাধারণত পরিবর্তনের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করে; কিংবা পরিবর্তনকে প্রতিহত করার প্রয়াস চালায়। ফলে সমাজে সংঘাত অনিবার্যভাবে চলমান। কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার সৃষ্টিশীলতায় এই আধিপত্যবাদী কাঠামো, প্রচলিত চিন্তা ও সামাজিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বোধের আলোকে সমাজবাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেই অনুযায়ী প্রতিরোধের ভাষা নির্মাণ করেছেন। মোস্তফা মোহাম্মদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্যে জীবন ও সমাজ গ্রন্থে ইলিয়াসের এই চিন্তা, সাহিত্যকর্ম এবং সংগ্রামের রূপরেখা সূক্ষ্ম ও দক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে।

লেখক জানিয়েছেন : পল্লী বাংলার হতদরিদ্র ও নিরন্ন মানুষের জীবনই কেবল নয়, শহুরে মধ্যবিত্ত ও প্রলেতারীয় শ্রেণির জটিল বাস্তবতাও ইলিয়াসের সাহিত্যে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। তার রচনায় এক গভীর, সমগ্রতাস্পর্শী মানবপ্রেমের প্রকাশ ঘটে, যা জীবনঘনিষ্ঠ বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত সমাজের দালালসুলভ মানসিকতা ও দ্বিচারিতাকে তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চিহ্নিত করেছেন গল্প ও উপন্যাসে। সমাজের শ্রেণিবৈষম্যের বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরতে ইলিয়াস মানুষের জীবনের গভীরতম স্তরে প্রবেশ করেছেন এবং আজীবন নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তার সাহিত্যজগতে সাধারণ মানুষই প্রধান চরিত্র, যাদের জীবনসংগ্রাম ও বাস্তবতাই তার সৃষ্টির মূল উপজীব্য। পাঁচটি গল্পগ্রন্থ ও দুটি উপন্যাসজুড়ে এই জীবনবোধ ও সমাজ সচেতনতার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর ছড়িয়ে আছে, যা বাংলা কথাসাহিত্যে তাকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

‘উপসংহার’ বাদে মোস্তফা মোহাম্মদের গ্রন্থটিতে চারটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ের শিরোনামেই লেখক এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যার ভেতরেই নিহিত রয়েছে উত্তর অনুসন্ধানের দিকনির্দেশ। আসলে কী খুঁজছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস? কেন তার দিন-রাত অস্থিরতা, উদ্বেগ, আর নির্ঘুম দৃষ্টি? জমজমাট আড্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও তিনি কেন নিরন্তর চিন্তা, প্রশ্ন ও অনুসন্ধানে নিমগ্ন থাকতেন? এসব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যায় ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মানসগঠন, জীবনবোধ ও শিল্পচিন্তা’ শীর্ষক অধ্যায়ে। প্রতিভার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিষ্ঠিত সমাজবাস্তবতাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে না নিয়ে তাকে নতুনভাবে দেখা, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের প্রয়াস চালানো। ইলিয়াসও ছিলেন সেই ধরনের শিল্পী, যিনি কোনো প্রথাগত শিল্পশৃঙ্খলে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। গবেষণালব্ধ তথ্যের আলোকে গবেষক দেখিয়েছেন : পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বিচারে ইলিয়াসকে প্রথাগত মার্কসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তিনি যেমন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সংকীর্ণতা ও অদূরদর্শিতার সমালোচনা করেছেন, তেমনি বামপন্থি রাজনীতির সীমাবদ্ধতাও তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, ইলিয়াসের বেড়ে ওঠা মুসলিম লীগের রাজনৈতিক পরিবেশে হলেও তার পারিবারিক আবহ ছিল উদার ও ধর্মীয় অনুভূতিসমৃদ্ধ। সেখানে পরবর্তী প্রজন্মের মানসগঠনে কোনো চাপিয়ে দেওয়া আদর্শ কাজ করেনি; বরং স্বাধীন চিন্তার বিকাশের জন্য একটি উন্মুক্ত পরিসরই ছিল প্রধান শক্তি।

ইলিয়াসের সৃষ্টিশীল অনুসন্ধানে লক্ষ করা যায় : তিনি যতই সামনে অগ্রসর হয়েছেন, ততই ফিরে তাকিয়েছেন ইতিহাসের গভীরে। চিলেকোঠার সেপাইখোয়াবনামা—এই দুই উপন্যাসে প্রায় দুই শতাব্দীর সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি শিল্পরূপ দিয়েছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে পটভূমি করে শহর ও গ্রামের অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রামকে তিনি চিলেকোঠার সেপাই-এ রূপায়িত করেছেন। প্রায় এক দশক পর প্রকাশিত খোয়াবনামায় উঠে এসেছে গ্রামীণ জীবনের অন্তর্লীন ইতিহাস ও লোক-ঐতিহ্য। আধুনিক নগরায়ণ ও আকাশসংস্কৃতির প্রভাবে যখন বাঙালি সংস্কৃতি ক্রমশ সংকুচিত, তখন এই উপন্যাস আমাদের নিজস্ব শিকড়ে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ‘খোয়াবনামার গান : গানে জীবন, জীবনের গান’ অংশে লেখকের গভীর মনন ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে।

‘কথাসাহিত্য ও সাহিত্যকোষ’ শীর্ষক অধ্যায়টি নির্দ্বিধায় ‘ইলিয়াসবোধিনী’ হিসেবে পাঠককে আলোকিত করবে। ইলিয়াসের প্রতিটি রচনার চরিত্র, স্থাননাম, ভূগোল, কাহিনি, প্রেক্ষাপট ও সারসংক্ষেপ গবেষক নিপুণ নিষ্ঠায়, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় তুলে এনেছেন। প্রায় দুই যুগের নিরলস সাহিত্য-সাধনার ফলেই এই অসাধ্যকে সাধন করতে সক্ষম হয়েছেন লেখক। অধ্যায়টি পাঠকের কাছে অনুসন্ধিৎসু গ্রন্থটির প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াবে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা কথাসাহিত্যে এক দীপ্ত ও অনিবার্য উপস্থিতি। তার রচনায় ব্যক্তি, সমাজ ও ইতিহাস এক গভীর শিল্পসমন্বয়ে মূর্ত হয়েছে। এ ছাড়া তার গল্প ও উপন্যাসে পরিস্ফুট হয় মানুষের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং সংগ্রামী জীবনের সত্য। তিনি কেবল কাহিনিকার নন, সময়ের এক নির্মোহ ও তীক্ষ্ণ ভাষ্যকার। মোস্তফা মোহাম্মদের বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থটি ইলিয়াসের সাহিত্যজগৎ অনুধাবনে পাঠকের এক মূল্যবান সহচর হয়ে থাকবে।