চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং প্রতীক্ষিত ম্যাচগুলোর একটির সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। একদিকে ঘরের মাঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে মার্কিন সরকারের কঠোর ভিসানীতি ও বেস ক্যাম্প বিতর্ক সব মিলিয়ে মাঠের বাইরের চরম অস্থিরতা সঙ্গী করে আজ মঙ্গলবার সকালে (বাংলাদেশ সময়) বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘জি’-এর উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। কাগজে-কলমে এটি ফুটবল ম্যাচ হলেও, ম্যাচটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক চাপ। তবে সব বিতর্ক একপাশে সরিয়ে রেখে ইরানের কোচ এবং ফুটবলাররা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা এখানে কোনো রাজনীতি করতে আসেননি, এসেছেন ফুটবল খেলতে।
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে, যেখানে আয়োজক দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) এমন একটি দলকে স্বাগত জানাচ্ছে, যাদের সঙ্গে তারা সরাসরি যুদ্ধাবস্থায় লিপ্ত। চলতি বছরের শুরুতে ইরানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের ওপর সরকারি দমনপীড়ন এবং গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের কারণে ইরান দলটির ওপর মানসিক চাপ আকাশচুম্বী।
এর ওপর যোগ হয়েছে মার্কিন প্রশাসনের নানামুখী নিষেধাজ্ঞা। ইরান ফুটবল দলের বেশ কিছু স্টাফকে মার্কিন ভিসা দেওয়া হয়নি। এমনকি ম্যাচের দিন ছাড়া বাকি সময় তাদের আমেরিকার মাটিতে অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায়, বাধ্য হয়ে ইরানকে তাদের বেস ক্যাম্প করতে হয়েছে মেক্সিকোর টিজুয়ানাতে। ম্যাচ খেলার জন্য মেক্সিকো থেকে ফ্লাইটের দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় লস অ্যাঞ্জেলেসে পা রেখেছে ‘টিম মেল্লি’।
নিউজিল্যান্ড ম্যাচকে সামনে রেখে সোফি স্টেডিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনটি ফুটবলীয় আলোচনার চেয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। সাংবাদিকরা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলেন দলটির প্রস্তুতিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের ভূমিকা নিয়ে।
এসব প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে ইরানের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে সাংবাদিকদের খোঁচা মেরে বলেন, ‘কেউই ফুটবল নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না! আমরা নিউজিল্যান্ডের মতো দারুণ একটি দলের বিপক্ষে খেলছি। আমি আশা করি, এটি একটি ভালো ম্যাচ হবে। রাজনীতির খবরের জন্য আপনাদের অন্য শহরের রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে যাওয়া উচিত।’ অলিম্পিয়াকোসে খেলা এই তারকা ফুটবলার আরও যোগ করেন, এই ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বকাপের আসল আনন্দ এবং ফিফার শান্তির বার্তাকে ব্যাহত করছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রায় পৌনে ৪ লাখ ইরানি প্রবাসীর বসবাস, যার কারণে এই এলাকাকে ‘তেহরানঞ্জেলেস’ও বলা হয়। কোচ আমির ঘালিনোই আশা করছেন, মাঠে প্রায় ৩৫ হাজার ইরানি সমর্থক উপস্থিত থাকবেন এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ঘরের মাঠের মতো সুবিধা পাবেন।
তবে গ্যালারির পুরো চিত্রটা ইরানের পক্ষে না-ও থাকতে পারে। ইতিমধ্যেই খবর এসেছে, প্রবাসী ইরানিদের একটি বড় অংশ স্টেডিয়ামের বাইরে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে। স্টেডিয়ামে ইসলামি বিপ্লবের আগের ঐতিহাসিক ‘সিংহ ও সূর্যখচিত’ পতাকা আনার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের, যা ফিফা কর্র্তৃক নিষিদ্ধ।
এই বিক্ষোভ নিয়ে কোচ ঘালিনোই বলেন, ‘ইরানি জাতি হিসেবে আমরা দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা প্রতিটি ইরানিকে সম্মান করি। আমরা রাজনীতির মানুষ নই। আমাদের মাথায় এই মুহূর্তে দেশের মানুষের মুখে আনন্দ ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই। আমরা কঠিন পরিস্থিতি ও কষ্টকে সুযোগে রূপান্তর করতে অভ্যস্ত।’
ভ্রমণ জটিলতা এবং দেরিতে পৌঁছানোর কারণে দলের প্রস্তুতিতে যে ব্যাঘাত ঘটেছে, তা অকপটে স্বীকার করেছেন কোচ। এর ওপর দলের সবচেয়ে বড় তারকা ফরোয়ার্ড সর্দার আজমুনের অনুপস্থিতি ইরানকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসকের সঙ্গে ছবি পোস্ট করে সরকারের রোষানলে পড়ে তার দল থেকে বাদ পড়ার গুঞ্জন থাকলেও, কোচ ঘালিনোই বিষয়টিকে ‘ফুটবলের অংশ’ বলেই এড়িয়ে গেছেন।
সব বাধা পেরিয়ে আজ মাঠের ফুটবলটাই কথা বলবে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরান কি পারবে মাঠের বাইরের বারুদে পরিস্থিতি সামলে বিশ্বমঞ্চে একতার জয়গান গাইতে?