‘রেকর্ড ভেঙে গেলে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই; রেকর্ড তো তৈরিই হয় ভেঙে ফেলার জন্য। আর আমার ব্যক্তিগত চাওয়া যদি বলেন, তবে আমি চাইব মেসিই যেন এই রেকর্ডটি ভাঙুক। আমি সবসময়ই মেসির একজন মস্ত বড় ভক্ত, মেসি এক অনন্য জাদুকর।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসে থাকা জার্মানির মিরোস্ল্যাভ ক্লোসার এই একটি উক্তিই যেন চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের আবহকে রাতারাতি বদলে দিয়েছে। চারটি বিশ্বকাপে মোট ১৬টি গোল করে রেকর্ড বুক নিজের দখলে রাখা এই জার্মান কিংবদন্তি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এবারের বর্ধিত সংস্করণে ম্যাচ বাড়ার কারণে তার রেকর্ডটি অক্ষুন্ন রাখা কঠিন। তবে সেই রেকর্ড যদি কেউ ভাঙেন, ক্লোসা চান সেটি যেন লিওনেল মেসির হাত ধরেই হয়। আর এই আশীর্বাদ মাথায় নিয়েই বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকালে আলজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচ দিয়ে নিজেদের বিশ্বজয়ের নতুন মিশন শুরু করছে আর্জেন্টিনা।
কিন্তু কানসাস সিটির কমপাস মিনেরাল সেন্টারে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের এই মহাযজ্ঞের প্রস্তুতি মোটেও রূপকথার মতো মসৃণ নয়; বরং সেখানে জড়িয়ে আছে ইনজুরির শঙ্কা, ভাঙা আঙুলের জেদ আর এক কোচের রণকৌশলের তুমুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
আর্জেন্টাইন শিবিরের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদটি এসেছিল গোলপোস্টের নিচে থেকে। ডান হাতের অনামিকায় ফ্র্যাকচার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘ডিবু’ মার্তিনেজকে ঘিরে। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ইউরোপা লিগের ফাইনাল জেতার পর প্রথমবার নম্বর ৫ বল হাত দিয়ে ছুঁয়েছেন তিনি। অনুশীলনে গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ দূরে রেখে ডিবু এক বিশেষ পরীক্ষা দিয়েছেন। আঙুলে বিশেষ রবার প্যাড এবং প্রচুর টেপ পেঁচিয়ে তিনি শতভাগ সফলভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, যার ফলে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শুরু করা এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত।
এই ৩৩ বছর বয়সী গোলরক্ষকের এই অবিশ্বাস্য জেদের পেছনে কেবল দলের জয় নয়, কাজ করছে একটি ব্যক্তিগত উন্মাদনাও! ডিবু নিজেকে ‘পরিসংখ্যানের রোগী’ বলে দাবি করেন। আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে ৫৯ ম্যাচে ৪১টি ক্লিন শিট (কোনো গোল না খাওয়া) রাখা ডিবুর লক্ষ্য এখন কিংবদন্তি সার্জিও ‘চিকিতো’ রোমেরোর ৪৭টি ক্লিন শিটের রেকর্ডটি ভাঙা। আলজেরিয়া ম্যাচ দিয়েই তিনি সেই রেকর্ডের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে চান।
আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার লেফট-ব্যাক নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ডান পায়ের সোলেয়াস পেশির অতিরিক্ত চাপের কারণে আলজেরিয়া ম্যাচ থেকে নিশ্চিতভাবেই ছিটকে গেছেন। আর এই একটি ইনজুরিই কোচ লিওনেল স্ক্যালোনির চিরচেনা ছকে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছে। তাগলিয়াফিকোকে ছাড়া রক্ষণভাগ কীভাবে সাজাবেন, তা নিয়ে রোববার অনুশীলনে দুটি ভিন্ন রণকৌশল পরখ করেছেন স্ক্যালোনি:
৩-৫-২ ফরমেশন (ঝুঁকিপূর্ণ ছক) : ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে নিয়ে তিন ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ। যেখানে উইংব্যাক হিসেবে দেখা যেতে পারে হুলিয়ানো সিমিওনে এবং থিয়াগো আলমাদাকে। এতে বেঞ্চে চলে যাবেন কিছুটা ফিটনেস সমস্যায় থাকা মন্তিয়েল ও মলিনা।
৪-৩-৩ ফরমেশন (স্ক্যালোনির প্রিয় ছক) : এখানে কুটি রোমেরোকে বসিয়ে ওতামেন্দি ও লিসান্দ্রোকে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে রেখে, বাম প্রান্তে ফাকুন্দো মেদিনাকে খেলানো হতে পারে। অথবা লিসান্দ্রো নিজেই লেফট-ব্যাকে সরে গিয়ে কুটি রোমেরোকে মাঝে জায়গা করে দিতে পারেন।
মাঝমাঠের ত্রয়ী রদ্রিগো ডি পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজ যথারীতি অপরিবর্তিত থাকছেন। আর আক্রমণভাগে লিওনেল মেসির সঙ্গী হিসেবে জুলিয়ান আলভারেজের চেয়ে ফর্মে থাকা লাউতারো মার্টিনেজই (‘এল তোরো’) এগিয়ে আছেন, যিনি ইন্টার মিলানের হয়ে এই মৌসুমে ২২টি গোল করেছেন।
লিওনেল মেসি নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে পা রেখে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার (২৬টি ম্যাচ) পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে ১৩টি গোল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কাতার বিশ্বকাপে ১০টি গোলে (৭ নিজে গোল, ৩ অ্যাসিস্ট) ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মেসির সামনে এখন ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ছোঁয়ার মিশন। যদিও একই রেকর্ডের পেছনে ১২ গোল নিয়ে ছুটছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেও!
তবে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এই খেলায় আর্জেন্টিনা দল নিজেদের মূল ছন্দ হারাতে রাজি নয়। ম্যাচের আগে স্ক্যালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এখানে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক বা ভার্টিগো নিয়ে কথা বলা বৃথা। আমাদের মূল শক্তি হলো একসঙ্গে পাসিংয়ের জাল বোনা, সবাই মিলে একসঙ্গে আক্রমণ করা। কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছি বলে আমাদের এই চিরচেনা দর্শন আমরা বিসর্জন দেব না। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে সবসময়ই চ্যাম্পিয়নের মতো দাপট দেখাতে আসে, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।’
ক্লোসার শুভকামনা আর দিবু মার্তিনেজের ভাঙা আঙুলের জেদ সঙ্গী করে পাসিং ফুটবলের সেই চিরন্তন ছন্দ নিয়ে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আরেকটি বিশ্বকাপ রূপকথা লিখতে প্রস্তুত স্ক্যালোনির আর্জেন্টিনা!