বিলাসী জীবনে তাড়ার ভয়

ঝলমলে আলো, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, দামি গাড়ি আর বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যাওয়া অনেকেই বিদেশে পালিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে শীর্ষ অপরাধী, অর্থ পাচারকারী আর রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া আসামির সংখ্যাই বেশি। বিদেশে গিয়েও তারা বিলাসী জীবনযাপন করছেন। কিন্তু তাদের সেই আরাম-আয়েশে ছেদ পড়েছে। কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। গত শুক্রবার দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন আলোচিত ও প্রতাবশালী সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। তারপর থেকেই অনেকের মধ্যেও ভর করেছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক। অনেকে ডেরা পরিবর্তনের চেষ্টাও করছেন বলে তথ্য এসেছে।

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম অস্বস্তি আর অজানা আতঙ্ক। ‘কখন দরজায় কড়া নাড়বে পুলিশ?’ কিংবা ‘কখন হাতকড়া পরবে এই ভয় এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে দেশের বাইরে থাকা পলাতক আসামিদের। কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোলের’ রেড নোটিসের কারণে এখন আর বিদেশে গিয়েও পার পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আছে। ফলে বিলাসী জীবনেও কাটাতে হচ্ছে আতঙ্কের প্রহর।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী, রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন অপরাধীর ২৯ জনের নতুন একটি তালিকা ইন্টারপোলে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের নামে রেড নোটিস জারির আবেদন করা হয়। তালিকাটি যাচাই-বাছাই করে রেড নোটিসের জন্য আরেকটি তালিকা চূড়ান্ত করবে ইন্টারপোল। ওই তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন অপরাধীর নাম রয়েছে। তারা ১৭টি দেশে অবস্থান করছেন। তবে বেশিরভাগই দুবাই, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। পটপরিবর্তনের আগে প্রদত্ত তালিকার ৬৬ জনের নামে রেড নোটিস জারি করেছে ইন্টারপোল।

নাম প্রকাশ না করে ভারতে থাকা এক আওয়ামী লীগ নেতা টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তারের পর আমরা কিছুটা আতঙ্কে আছি। যদিও ইন্টারপোলে আমার নাম নেই। তারপরও আতঙ্ক কাটছে না। কলকাতায় অনেকেই আছেন, তাদের নাম আছে ইন্টারপোলে। দুবাইয়ে অনেকে আছেন, তারা দিনের বেলায় বের হচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ স্থান পরিবর্তনের চিন্তা করছেন। সব মিলিয়ে আমরা খারাপ অবস্থায় আছি। 

হিমশিম ইন্টারপোলের : আগের রেড নোটিস এবং নতুন করে দেওয়া তালিকা কার্যকরে হিমশিম খেতে হচ্ছে ইন্টারপোলকে। ধরা পড়ছে না তালিকাভুক্ত অপরাধীরা। নোটিসধারী অপরাধীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। গত ৫ বছরের ব্যবধানে মাত্র তিন অপরাধীকে বাংলাদেশে ফেরত আনতে পেরেছে সংস্থাটি। বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করলেও দেশে আনা যাবে কি না তা নিয়ে চলছে আলোচনা। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হলেও তাকে দেশে আনা সম্ভব হয়নি। ওই সময় কূটনৈতিক চ্যানেলসহ সরকার সব ধরনের চেষ্টা করেও জিসানকে ফেরত আনতে পারেনি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ টিম দুবাই গিয়ে ওই দেশের পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন। তারপরও তাকে আনা যায়নি।

নোটিসপ্রাপ্তদের বিষয়ে পুলিশের নানামুখী চেষ্টা : অপরাধীদের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিসপ্রাপ্তরা দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে। তাদের দেশে ফেরত আনতে পুলিশের নানামুখী প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। আদালতের নির্দেশনানুযায়ী পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের কাছে বাংলাদেশের এনসিবি আবেদন করে। আবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে যৌক্তিক মনে হলে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করে। তারা আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখতে যথেষ্ট সময় নিয়ে থাকে। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি; বিশেষ করে খুন, মানব পাচার, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির মতো অপরাধীদের ক্ষেত্রে রেড নোটিস ইস্যু করে। তবে রাজনৈতিক, সামরিক বা বর্ণগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তারা সাধারণত নোটিস ইস্যু করে না।

যাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করছে ইন্টারপোল : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নতুন করে রেড নোটিস জারির আবেদনের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও দাগি অপরাধী। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আ ক ম মোজাম্মেল হক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী আইজ গেইটর ওমর ফারুক কচি, আলম তাওফিক, মিন্টু, আতাউর রহমান, নাসির উদ্দিন রতন, নজরুল দিপু, ফেরদাউস কালাম, প্রসন্ন সরদার, মজনু আহমেদ, জাফর আহমেদ ওরফে মানিক, আব্দুল জাব্বার, শাহাদৎ হোসাইন, ইউসুফ, আমিনুর রসুল, মিয়া চান, শেখ হারুন, মনোতোস বসাক, সুজিদ সুলতান, আজিজ মোস্তাক, মালকার স্বপন, মোবারক হোসাইন, মজনু আহমেদ, ইকরাম নাইম খান, সুরত আলম, আহমদ কবির, জিসান, সালাহউদ্দিন, নবী হোসেন, আতাউর রহমান মাহমুদ চৌধুরী, মাকসুদ নাজমুল, শহীদুল ইসলাম, আগা শামীমসহ অনেকের নাম।

ফেরারিদের পছন্দের দেশগুলোতে বেশি নজরদারি : জানা যায়, ইন্টারপোলের প্রধান কাজ বিভিন্ন দেশের পুলিশকে সহায়তা করা। পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও গুমের বিভিন্ন অভিযোগে ইতিমধ্যে অনেককে ইন্টারপোল নজরদারিতে রেখেছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিস কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়, এটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক অনুরোধ। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো পলাতক আসামিকে খুঁজে বের করে সাময়িক গ্রেপ্তার বা নজরদারিতে রাখে, যাতে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়। বিভিন্ন কারণে যারা বিদেশে পালিয়ে গেছেন তাদের অনেকের পছন্দের দেশের তালিকায় দুবাই, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। বিশেষ করে দুবাইয়ের ‘গোল্ডেন ভিসা’ বা মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে অনেকেই সেখানে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, একটা সময় দুবাইকে অপরাধীদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য মনে করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ ও আইনি সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে সেখানকার চিত্র বদলে গেছে। স্বর্ণ চোরাচালান, অর্থ পাচার ও খুনের মামলার আসামিরা এখন দুবাই পুলিশের কঠোর নজরদারিতে আছে এবং তারা গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছে।

পছন্দের গন্তব্য দুবাই : গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধী এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা দুবাইকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করতেন। দুবাইয়ের সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিনিয়োগের সুযোগ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে অনেক বাংলাদেশি পলাতক সেখানে অবস্থান করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তবে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবরে তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম আতঙ্ক। ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত জিসান আহমেদ দীর্ঘ বছর ধরে দুবাইয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন। তার বিরুদ্ধে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় হোটেল সানরাইজে দুই পুলিশ হত্যাসহ এক ডজনেরও বেশি হত্যা মামলা আছে। এসবির পুলিশ পরিদর্শক মামুন ইমরান খান হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানও কয়েক বছর ধরে দুবাইয়ে বসবাস করছেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিসের তালিকায় আরাভ খান ৬৩তম বাংলাদেশি। তাকে ২০২৩ সাল থেকেই দেশে ফেরত আনার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

ট্রমায় ভুগছেন অনেকেই : পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাইরে থেকে অপরাধীদের জীবনযাপন জাঁকজমকপূর্ণ মনে হলেও, গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী তাদের ভেতরের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদেশে গিয়ে প্রথম যে কাজটি তারা করেন, তা হলো ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি এবং নাম পরিবর্তন। নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে ছদ্মনামে বাঁচতে গিয়ে তারা চরম মানসিক ট্রমায় ভোগেন। যে কোনো দামি রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে বা শপিং মলে গেলে তাদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ থাকে। বাংলাদেশ কমিউনিটির কেউ তাদের চিনে ফেলল কি না এ ভয় সারাক্ষণ তাড়া করে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনের কড়াকড়ির কারণে অবৈধ পথে নেওয়া টাকা বৈধ করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক দেশেই তাদের ব্যাংক হিসাব তল্লাশি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ‘ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো’ বা ইন্টারপোল ঢাকা শাখা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কোনো অপরাধী দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলেই বা সীমান্ত পার হলেই ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলকে জানানো হচ্ছে। বিদেশে থাকা অপরাধীদের সম্পত্তি ক্রোক করতে বিভিন্ন দেশের বিচার বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে পলাতক আসামিদের গতিবিধি, আইপি অ্যাড্রস ও লাইভ লোকেশন ট্র্যাক করে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় তাদের গ্রেপ্তারের হার বেড়েছে।

আবার ইন্টারপোলের রেড নোটিস থাকা সত্ত্বেও অনেক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর পেছনে অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি ‘অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি’ নেই। ফলে আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। ইউরোপ বা আমেরিকার দেশগুলোতে গিয়ে অপরাধীরা ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ প্রার্থনা করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিলেও শান্তি পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে সবসময় এক ধরনের ভয় থাকছে।