বেনজীরকে ফেরানো কঠিন

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর দেশ-বিদেশে বইছে আলোচনার ঝড়। তাকে কোন প্রক্রিয়ায় দেশে আনা হবে, তা নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলে চলছে আলোচনা। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে গতকাল বিশেষ বৈঠকও করেছে। তবে পুলিশের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা যতই উদ্যোগ নেওয়া হোক না কেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানো কঠিন হবে। তাকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আগামী সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষ টিম দুবাই যাবে। গ্রেপ্তারের পর বেনজীরের কাছ থেকে দুটি দেশের পাসপোর্ট পেয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে কোন দেশের পাসপোর্ট, তা জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বেনজীর আহমেদ শুধু একজন পলাতক আসামিই নন, তিনি একসময় বাংলাদেশের পুলিশপ্রধান ছিলেন। এর আগে র‌্যাবের মহাপরিচালক ও ডিএমপির কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর তিনি দেশ ছাড়েন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ফেরানো গেলে এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও সরকারের জন্য বড় প্রতীকী সাফল্য হবে। তবে বেনজীরকে ফেরাতে হলে গ্রেপ্তারের দিন থেকে এক মাসের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে না পাঠালে আমিরাতের আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রত্যর্পণ অনুরোধে মামলার শক্ত ভিত্তি দেখাতে হবে কোন অপরাধে তাকে চাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের কোন আইনে অভিযোগ, আমিরাতের আইনে তার সমতুল্য অপরাধ কী, বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা কী, তার বিরুদ্ধে আদালতের কী আদেশ আছে সবকিছু উপস্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়েও সক্রিয় হতে হবে। কারণ, প্রত্যর্পণ শেষ পর্যন্ত আইনি ও কূটনৈতিক দুই ধরনের প্রক্রিয়ায় হয়। আদালত নথি গ্রহণযোগ্য মনে করলেই প্রশাসনিক অনুমোদন, হস্তান্তরের সময়সূচি ও নিরাপদে দেশে আনার ব্যবস্থা হবে। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে, বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়। এটি দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, জালিয়াতি, অর্থপাচার বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে দেখাতে হবে, বাংলাদেশে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। তাহলেই হয়তো তাকে দেশে আনা কিছুটা সহজ হতে পারে।

ফেরত আনা কঠিন হবে : পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেনজীরের গ্রেপ্তার অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বড় অগ্রগতি। তবে এটি শেষ ধাপ নয়, পুলিশের রেড নোটিসে কোনো ব্যক্তি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হতে পারেন কিন্তু তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নির্ভর করে যে দেশে তিনি আটক হয়েছেন, সেই দেশের আইন, আদালত, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত চুক্তি, কূটনৈতিক তৎপরতা ও মামলার নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতার ওপর। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন হবে। এমনও হতে পারে তাকে আনাই যাবে না। কারণ, হিসেবে তারা বলেন ‘বেনজীর আহমেদ দুটি দেশের নাগরিক বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাছাড়া দুবাইয়ে তার সহায়-সম্পদ আছে। ওই দেশের এক নাগরিকের সঙ্গে তার ব্যবসা আছে। হুট করে তাকে আনা যাবে না। আজ (গতকাল) আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, বেনজীর আহমেদ মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবি নিয়োগ দেবেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে গ্রেপ্তারের পর দুবাই সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়া হয়। পুলিশের একটি টিম ওই দেশে গিয়ে আলোচনাও করে। কিন্তু তাকে আনা যায়নি। জিসানের ওই দেশে ব্যবসা ও বেশকিছু সহায়-সম্পদ আছে। এসব দিক দুবাই কর্তৃপক্ষ বেশি আমলে নিচ্ছে।’

তবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে বর্তমানে কোনো কার্যকর দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও প্রায় একযুগ আগে দুই দেশের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর একটি নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি ও দন্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের স্থানান্তর-সংক্রান্ত চুক্তি। তিনি বলেন, কোনো বাংলাদেশি যদি ইউএইর আদালত কর্তৃক দন্ডিত হন, তাহলে তিনি বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হয়ে সাজা ভোগ করতে পারবেন। তবে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন না। এ আইনজীবী আরও বলেন, ১৯৭৪ সালের প্রত্যর্পণ অ্যাক্টের ৩ ধারা অনুযায়ী যদি বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকে, তাহলে সেই দেশকে সরকার ‘ট্রিটি স্টেট’ হিসেবে ঘোষণা করবে এবং চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী অপরাধী আদান-প্রদান করা যাবে। আর ৪ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো দেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি না-ও থাকে, তবুও সরকার চাইলে সেই দেশের সঙ্গে উক্ত আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও তা অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সেটি ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ইউএই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করবে। তবেই বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার সম্ভব।’

এনসিবির চিঠিতে যা আছে : পুলিশ সূত্র জানায়, এনসিবিকে আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএইর ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে লিখিত আবেদন পাঠাতে হবে। আবেদনের সঙ্গে আরবি ভাষায় অনূদিত, যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত নিম্নোক্ত তথ্য ও নথি সংযুক্ত করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রত্যর্পণযোগ্য ব্যক্তির নাম, পরিচয়, ছবি (যদি থাকে), জাতীয়তা, ঠিকানা এবং পরিচয় শনাক্তে সহায়ক অন্যান্য তথ্য; অভিযুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, নির্ধারিত শাস্তি ও তামাদি-সংক্রান্ত বিধানের অনুলিপি, অনুরোধকারী দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার বিস্তারিত বিবরণ, যেখানে অপরাধের প্রকৃতি, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও অপরাধ সংঘটনের স্থান উল্লেখ থাকতে হবে। তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি সংযুক্ত করতে হবে, দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আদালতের রায় বা দণ্ডাদেশের সত্যায়িত অনুলিপি, অপরাধের বিবরণ, আরোপিত শাস্তি এবং রায় কার্যকরযোগ্য হওয়ার প্রমাণপত্র ইত্যাদি থাকতেই হবে।

আরবি ভাষার নথিপত্র যাচ্ছে দুবাই : দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনতে নথিপত্র প্রস্তুত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে এসব নথিপত্র আরবি ভাষায় প্রস্তুত করে পাঠানো হবে। গতকাল দুদক থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।  দুদকের তথ্য মতে, বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জন মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলে রেড এলার্ট জারির আবেদন করা হয়। দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইন্টারপোল রেড এলার্ট জারি করে ও তাকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার নথিপত্র প্রস্তুত শুরু করেছে সংস্থাটি।

দুদকের একজন মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড এলার্ট জারির আবেদন করার সময় মামলার এজাহার ও অন্যান্য ডকুমেন্ট ইংরেজিতে রূপান্তর করে পাঠানো হয়। এখন দুদকের মামলায় বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে দুদক থেকে তার মামলার নথি ও আদালতের আদেশসহ সব ডকুমেন্ট আরবিতে পাঠাতে হবে। আমরা নথিপত্র প্রস্তুত করছি। তিনি বলেন, ক্রসবর্ডার আসামি হলে তাকে ফিরিয়ে আনা অনেক কষ্ঠসাধ্য কাজ। এ ধরনের আসামিদের ফিরিয়ে আনতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সব ডকুমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করার পরও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় সে দেশের সরকার।

ভিন্ন দেশের পাসপোর্ট থাকলে কিছুটা সমস্যা : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে হলে যথাযথ নথিপত্র, পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারপোল অনেক আসামি গ্রেপ্তার করলেও সবাইকে দেশে আনা যায়নি। আবার কোনো কোনো আসামি অন্য দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। তারা যদি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অস্বীকার করেন, তাহলে দেশে ফেরত আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বেনজীর আহমেদের অন্য দেশের পাসপোর্ট আছে বলে আমরা জেনেছি। এই ক্ষেত্রে কূটনৈতিক চেষ্টা জোরালো করতে হবে।

বেনজীরের স্ত্রী-কন্যারাও আছেন আতঙ্কে : পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিস’ এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বেনজীরের সহযোগীরাও যেকোনো সময় আইনের আওতায় আসতে পারেন। ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তারের পর তার সহযোগী ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে দুদক ও বিএফআইইউ বেনজীরের পাশাপাশি তার সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান করছে। সাবেক এই পুলিশপ্রধানের অবৈধভাবে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। বেনজীরের ব্যবসার অংশীদার ও বেনামি সম্পত্তির দেখভালকারীরা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন। সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও বেনজীর আহমেদ তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেন। ২০১৬ সালে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এতে আপত্তি জানালেও র‌্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন কতিপয় প্রভাবশালী কর্মকর্তা সেই পাসপোর্ট ছাড়িয়ে নেন। বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জিশান মীর্জা এবং দুই কন্যা ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর দীর্ঘ সময় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের পর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য আছেন বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।